চিলির মহান কবি পাবলো নেরুদা শুধু সাহিত্যের অঙ্গনেই নন, তিনি বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মানুষের মুক্তিসংগ্রামের প্রতীক। বহু সমালোচক তাঁকে 'রাজনৈতিক' কবি বলে খাটো করতে চেয়েছেন, যেমনটা মায়াকভস্কির ক্ষেত্রেও করা হয়েছিল। কিন্তু নেরুদা নিজেই তাঁর 'হৃদয়ে স্পেন' কাব্যগ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন কেন তিনি এমন কবিতা লেখেন, যা তথাকথিত সমালোচকদের কাছে কবিতার উপকরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
কেরুদার রাজনৈতিক চেতনার উৎস কী?
কেরুদা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সচেতন একটি দেশে আমি জন্মেছি। যারা লড়াই করে, তারা জনগণের কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন পায়। প্রকৃতপক্ষে চিলির সব লেখকই বামপন্থার সমর্থক। আমরা জনগণের সমর্থন পাই এবং তারা আমাদের বুঝতে সক্ষম।' এই বক্তব্য আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বুদ্ধিজীবীদের কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য লড়াই করেছিলেন।
কেরুদার কাব্যধারায় কোন প্রভাব কাজ করেছে?
কেরুদার কবিতা ক্যাস্টালিয়ান ঐতিহ্য আর চিলির লোকসাহিত্যের অপূর্ব মিশ্রণ। তিনি ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার ও আর্তুর র্যাঁবোকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। অন্যদিকে সোভিয়েত বিপ্লবের কবি মায়াকভস্কি ও আমেরিকার গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর ওয়াল্ট হুইটম্যান তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। নেরুদা লিখেছেন, 'আমরা সেই তরুণ বয়সে মায়াকভস্কির গলার স্বরে চমকে উঠলাম।'
কেরুদার কবিতায় কীভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ফুটে উঠেছে?
কেরুদার 'কয়েকটি ব্যাপারের ব্যাখ্যা' কবিতায় স্পেনের ওপর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর আক্রমণ ও মাদ্রিদের ওপর বোমাবর্ষণের চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন:
...আর একদিন সকালে সবকিছু জ্বলে উঠল দাউ দাউ
একদিন সকালে মাটি ফুঁড়ে
লাফিয়ে উঠল বহ্ন্যুৎসব
গোগ্রাসে গিলল জীবনকে,
তার পর থেকে আগুন আর আওন,
তার পর থেকে শুধুই বারুদ,
তার পর থেকে রক্ত আর রক্ত।
এই কবিতায় শিশু-হন্তারকদের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ ও ফ্যাসিবাদের নৃশংসতার চিত্র আমাদের ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
কেরুদার কবিতা কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
কেরুদার কবিতা শুধু সাহিত্য নয়, এটি মুক্তির জন্য সংগ্রামরত মানুষের অস্ত্র। তাঁর কবিতা আমাদের শেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কখনোই নিরপেক্ষ হতে পারে না। বরং এটি হতে হবে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে, মুক্তির পক্ষে। যেমনটি আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় দেখা যায়।
কেরুদা তাঁর কবিতা আবৃত্তি করতেন দেশের সর্বত্র, প্রতিটি গ্রামে ও শহরে। তিনি মনে করতেন এটি তাঁর কর্তব্য। এই দায়িত্ববোধ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি বাঙালিরও কর্তব্য আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
কেরুদার কবিতায় মার্ক্সবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও প্রতীকবাদের অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। তিনি ইউরোপীয় সুররিয়ালিজম, সিম্বলিজম ও রিয়ালিজমের এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে আরও গভীর, আরও বাঙ্ময়।
আজকের বিশ্বে যখন বিভিন্ন শক্তি আমাদের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলছে, তখন নেরুদার কবিতা আমাদের পথ দেখায়। তিনি আমাদের শেখান যে, কবিতা ও সাহিত্য হতে পারে মুক্তির অস্ত্র, প্রতিরোধের হাতিয়ার।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কেরুদা কেন 'রাজনৈতিক' কবি হিসেবে পরিচিত?
কেরুদা তাঁর কবিতায় ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এবং মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন।
কেরুদার কবিতায় বাংলার মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব কী?
কেরুদার কবিতায় ফ্যাসিবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বাংলার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর কবিতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কবিতার মতোই জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
কেরুদার কবিতা কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
আজকের বিশ্বে যখন বিভিন্ন শক্তি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে, তখন নেরুদার কবিতা আমাদের প্রতিরোধের পথ দেখায়। তাঁর কবিতা শেখায় যে সাহিত্য হতে পারে মুক্তির অস্ত্র।