লাদাখ প্রশাসন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক প্রতিষ্ঠিত ডেজার্ট ফ্লাওয়ার স্কুলের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। গত মঙ্গলবার লেহের মহকুমা শাসকের পাঠানো নোটিশে বলা হয়েছে, জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ হাইকোর্টে বিচারাধীন জমির মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্কুলের ক্লাস ও অন্যান্য কাজকর্ম চালানো যাবে না।
নোটিশ পেয়েছেন সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো, যিনি হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশাসনের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই স্কুলটি চালানো হচ্ছে। কিন্তু ওয়াংচুক নিজেই বলছেন, এর পেছনে আসল কারণ ভিন্ন।
সরকার বিরোধিতাই কি আসল অপরাধ?
সোনম ওয়াংচুক গণমাধ্যমকে সরাসরি অভিযোগ করেছেন, লাদাখের স্বীকৃতির দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যে লড়াই তিনি চালাচ্ছেন, সেটাই এই নোটিশের আসল কারণ। পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবি, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ককরোচদের আন্দোলনকে সমর্থন, আমরণ অনশন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিকে সমর্থন; একের পর এক অবস্থানে তিনি হয়ে উঠেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের চক্ষুশূল।
তাঁর ভাষায়, কেন্দ্রীয় সরকার এসব পছন্দ করছে না, তাই এমন নোটিশ। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; একটি দীর্ঘ সংগ্রামের সর্বশেষ অধ্যায়।
জমির ইতিহাস: ২০১৮ থেকে ২০২৫
২০১৮ সালের মে মাসে লাদাখের ফিয়াং থাং এলাকায় হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভসকে ১৩৪ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল। শর্তসাপেক্ষে ৪০ বছরের ইজারায় সেই জমির উদ্দেশ্য ছিল হিমালয় পার্বত্য এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নসংক্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
তখনও জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য বিভাজিত হয়নি। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সেই বিভাজন ঘটে, দুই পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সৃষ্টি হয়। সেই সিদ্ধান্তের সময় সোনম ওয়াংচুকসহ লাদাখের জনগণ কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিকে প্রবলভাবে সমর্থন করেছিলেন। আশা ছিল, নতুন ব্যবস্থায় লাদাখ পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা।
পরবর্তী বছরগুলোতে সেই আশা ভেঙে যায়। বিধানসভাসহ স্বশাসন মেলেনি, ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। শুরু হয় আন্দোলন। অনুগত শিল্পপতিদের হাতে লাদাখের খনি অঞ্চল তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে ওয়াংচুক জনমত গঠন করেন। তাঁর সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট: এই ধরনের উন্নয়ন লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ ধ্বংস করবে, পুরো হিমালয় অঞ্চলে বিপর্যয় নামবে।
২০২৫ সালের ২১ আগস্ট লাদাখ সরকার সেই জমি বরাদ্দই বাতিল করে দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, ইজারাসংক্রান্ত নীতিনিয়ম পালিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। দ্য ওয়ালের খবর অনুযায়ী, এবার সেই বিতর্কিত জমিতেই গড়ে ওঠা ডেজার্ট ফ্লাওয়ার স্কুলে হাইকোর্টের রায় না আসা পর্যন্ত তালা ঝোলানোর নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
আদালতে দুই পক্ষের দাবি
জমি বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করে হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভস। বিচার চলাকালে গত অক্টোবরে লাদাখ প্রশাসন হলফনামা দিয়ে জানায়, জমি বরাদ্দ ২০১৯ সালের মে মাসেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল। কারণ, এক বছরের মধ্যে ইজারা বাবদ চুক্তি সম্পন্ন হয়নি, জমির টাকাও জমা পড়েনি। প্রশাসনের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তাদের পাঠ্যক্রমও বিধিবদ্ধভাবে অনুমোদিত নয়।
সোনম ওয়াংচুক ও গীতাঞ্জলি আংমো আদালতে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন। ইজারা পাওয়ার পর জম্মু-কাশ্মীরের চরিত্র বদলে যাওয়া, কোভিডে কাজকর্ম স্তব্ধ হওয়া এবং পূর্ণ রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরের ফলে সরকারি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের দাবি, প্রশাসন নিজেই বলেছিল, সরকারি বিলম্ব হলেও নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে পারবেন তাঁরা।
নোটিশের তাৎক্ষণিক কারণ
গত ২২ সেপ্টেম্বর লেহ ডেপুটি কমিশনারকে গীতাঞ্জলি আংমো চিঠি লিখে স্কুলের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের জন্য একটি অনাপত্তিপত্র চেয়েছিলেন। প্রশাসনের দাবি, সেই ছাড়পত্র আসার আগেই স্কুলের ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া হয়েছে। আরো আনন্দের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অনুমোদন ছাড়াই স্কুল চালুর অভিযোগেই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে লাদাখ প্রশাসন। নোটিশে স্পষ্ট লেখা আছে, বিচারাধীন মামলায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু করা যাবে না।
আমাদের জন্য শিক্ষা
এই ঘটনা আমাদের জন্য কেবল পার্শ্ববর্তী দেশের খবর নয়। ১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে অর্জন করেছিলাম আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, নিজের ভাষায় কথা বলার ও নিজের ভূমিতে স্বশাসনের অধিকার। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি ধাপে আমাদের শিখিয়েছে: যে জাতি নিজের স্বীকৃতির দাবি জানায়, প্রবল রাষ্ট্রযন্ত্র তার ওপর নেমে আসে। লাদাখের মানুষ আজ সেই একই সংগ্রামে দাঁড়িয়ে; নিজের পাহাড়, নিজের ভূমি, নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রামে।
সোনম ওয়াংচুকের স্কুলের পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। সংবাদ প্রতিদিনের খবর অনুযায়ী, প্রশাসনের এই পদক্ষেপে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দিতে পারে কি শুধু সরকার বিরোধিতার অপরাধে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায়।
