লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদ ভবনের সামনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা ওঠানামা করছে; ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে পুনরায় যোগদানের প্রাথমিক আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে।
২০১৬ সালের ২৩ জুন ব্রিটেন গণভোটে ইইউ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রায় এক দশক পর, ২০২৬ সালের অক্টোবরে সেই নীরবতা ভাঙল। থিঙ্কট্যাংক আইপিপিআর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেন ইইউর পূর্ণ সদস্যপদ ব্রিটেনের সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। একই সময়ে গার্ডিয়ানের কলামিস্ট পলি টয়েনবি লিখেছেন, পুনরায় যোগদানের ওপর দীর্ঘদিনের নীরবতা এখন ভাঙা হয়েছে, তবে তাড়াহুড়ো করা বোকামি হবে।
এক দশকে সাত প্রধানমন্ত্রী, ভাঙা রাজনীতি
২০১৬ সালের সেই রাতের কথা মনে পড়ার কথা। রাত ১২:২০ মিনিটে সান্ডারল্যান্ডের ফলাফলে দেখা গেল ৬১.৩ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ভোর ৪:৪০ মিনিটে বিবিসি ঘোষণা দিল ব্রেক্সিট জয়ী হয়েছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে দেশটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। যাঁরা ইইউতে থাকার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।
একসময় 'পশ্চিমা বিশ্বের স্থিতিশীল পার্লামেন্টের মা' হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য গত ১০ বছরে সাতজন প্রধানমন্ত্রী বদলেছে। লেবার ও কনজারভেটিভ, উভয় দলই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এমন এক ক্ষত, যা আবার উন্মুক্ত করার সাহস এখনো কোনো দল দেখায়নি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেনের জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। সম্প্রতি জরিপে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ মানুষ আবার ইইউতে যোগ দিতে চান, আর ২৯ শতাংশ বাইরে থাকতে চান। সময়ের সঙ্গে এই সমর্থন বাড়ছে, কারণ প্রবীণ প্রজন্মের জায়গা নিচ্ছেন তরুণ ভোটাররা।
সার্বভৌমত্বের মরীচিকা এবং জোটের বাস্তবতা
আইপিপিআরের প্রতিবেদনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরা হয়েছে: ব্রেক্সিট ব্রিটেনকে বিশ্বরাজনীতির বড় জোটগুলোর সামনে একা ও বন্ধুহীন করে রেখেছে। এককালের বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আর পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না, কারণ তাদের জনগণ কাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনতে পারে, তা সবাই দেখেছে। ফলে চ্যানেল পারের পরিচিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উষ্ণ অভ্যর্থনা এখন বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, 'সার্বভৌমত্ব' আসলে এক প্রকার মরীচিকা। কারণ প্রতিটি চুক্তি বা বাণিজ্যচুক্তির জন্য মিত্রদের সঙ্গে সার্বভৌমত্ব ভাগ করে নিতে হয়। বর্তমান বরিস জনসন ও লর্ড ফ্রস্টের চুক্তিটি এতটাই অকার্যকর যে তা বজায় রাখা এক ধরনের দায়িত্বহীনতা।
কেমি ব্যাডেনক ও মাইকেল গোভ: অনুশোচনা নেই
কিন্তু জনমতকে উপেক্ষা করে কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক ইইউ রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন যে তিনি ক্ষমতায় এলে সব পরিবর্তন বাতিল করবেন, যা ব্রাসেলসের আলোচনাকে নস্যাৎ করার শামিল। অন্যদিকে ব্রেক্সিটের কারিগর মাইকেল গোভ এখনো দাবি করছেন, তিনি কোনো কিছুর জন্য অনুতপ্ত নন। তবে গার্ডিয়ানের কলামে টয়েনবি লিখেছেন, এসব কথায় জনগণ আর ভুলবে না।
টোরি দলটি তাদের আনা ব্রেক্সিট বিপর্যয়ের জন্য অনুশোচনা না করা পর্যন্ত রাজনৈতিক রাজ্য থেকে নির্বাসিত থাকবে, এটাই এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা।
আবার গণভোট: এখনই কি সময়?
৫২ শতাংশ বনাম ২৯ শতাংশের এই জনমত কি এতই শক্ত যে এখনই পাশা উল্টে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে? টয়েনবির উত্তর: না, এখনো নয়। জরিপের এই সমর্থন এখনো বেশ নরম ও ভঙ্গুর। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে গণভোটের ঝুঁকি নিয়েছিলেন এবং হেরেছিলেন। এবার আরও সতর্ক হতে হবে।
প্রতিবেদনে দুই পক্ষের যুক্তিরই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। ইউরো মুদ্রা গ্রহণ, অন্যান্য বাণিজ্যচুক্তি বাতিল, মাছ ধরার অধিকার ছেড়ে দেওয়া বা ইইউ বাজেটে মোটা অঙ্কের অবদান, এগুলো জনগণের মধ্যে লালবাতি জ্বালিয়ে দেয়। তবে ইইউতে ফেরার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে পাসপোর্টের দীর্ঘ সারি এড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হারিয়ে যাওয়া বৈদেশিক বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা।
শান্ত পরিবেশে আলোচনা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডার মধ্যে বিস্তর ফারাক। আগের গণভোটের সেই মিথ্যা আশ্বাসগুলোর কথা মনে আছে: সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে, তুর্কিরা আসছে, নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজে নাও। গণভোট আসলে এমনই উন্মাদনা তৈরি করে।
১৯৭১-এর শিক্ষা: স্বাধীনতার মূল্য আর জোটের অঙ্ক
একটি দেশের স্বাধীনতা কখনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একা দাঁড়িয়ে থাকার নাম নয়; জোট ও সম্মানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নাম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই স্বাধীনতার সংগ্রামে ছিল সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক জোট, ছিল আন্তর্জাতিক সমর্থন। একা দাঁড়ানোর গর্ব যে কত ব্যয়বহুল হতে পারে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেন তা দশকব্যাপী অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করছে।
জ্বালানি, পানি, পরিবহন বা বিমান চলাচলের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবায় যখন মারাত্মক সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ছে, তখন ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এক দশকে ব্রিটেন বদলে গেছে। ব্রেক্সিটপন্থীরা হয়তো অভিবাসনের ভয় দেখাবে, কিন্তু জরিপ বলছে 'ফ্রিডম অব মুভমেন্ট' নিয়ে মানুষ আগের মতো আর আতঙ্কিত নয়। এখন মানুষের প্রধান চিন্তা জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন নয়।
পরবর্তী যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে হবে, যেখানে লেবার পার্টির বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরীক্ষিত হবে। ততদিনে ইইউ বিষয়ক জনমত কোথায় দাঁড়াবে, তা-ই এখন ওয়েস্টমিনস্টারের বড় প্রশ্ন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ব্রিটেন কি আবার ইইউতে যোগ দেবে?
২০২৬ সালের অক্টোবরে আইপিপিআরের প্রতিবেদনে ইইউ পূর্ণ সদস্যপদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং ব্রাসেলসে আলোচনার খবর এসেছে। তবে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
ব্রেক্সিট ব্রিটেনের কত ক্ষতি করেছে?
আইপিপিআরের হিসাব অনুযায়ী ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
ব্রিটিশ জনগণ এখন কী চায়?
সম্প্রতি জরিপে ৫২ শতাংশ ইইউতে পুনরায় যোগ দিতে চান এবং ২৯ শতাংশ বাইরে থাকতে চান।
