আইএমএফের শর্তে শৃঙ্খলা নয়, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি আমাদের সার্বভৌমত্ব। আজ সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো নিয়ে গভীর ভাবনার সময় এসেছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে আইএমএফ তাদের ঋণ কর্মসূচির নকশা পর্যালোচনা করছে, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণের শর্তে জনগণের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
আইএমএফের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই সব দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো, যাদের অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক উন্নয়নশীল দেশে দেখা যাচ্ছে, আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় সরকার অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাচ্ছে, অথচ বেসরকারি ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধ অব্যাহত রাখছে। জনস্বার্থের বিনিয়োগ কমিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পুঁজি পাচার রোধে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন?
আইএমএফের কর্মসূচিতে অস্থিতিশীল পুঁজিপ্রবাহ ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজি প্রবাহ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়ায়, বিনিময় হারকে অনিশ্চিত করে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। আইএমএফের অর্থ কোনোভাবেই পুঁজি পাচারে ব্যবহার করা যাবে না।
আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা কেন জরুরি?
অর্থনীতি কোনো স্থির সমীকরণ নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত বা আর্থিক সংকটের মতো আকস্মিক ঘটনা ঘটতেই পারে। কর্মসূচির নকশায় মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য জরুরি বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে হবে। শিক্ষা, জ্ঞান ও অবকাঠামোর মতো খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে সাময়িকভাবে হিসাব মেলানো হলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি আরও দুর্বল হতে পারে।
গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা কি সম্ভব?
সরকারের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে জনগণের কাছ থেকে কোনো শর্ত আড়াল করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের ব্যবস্থা স্বচ্ছতার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে দুর্বল করে। সরকার ও আইএমএফের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, জনগণের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
আইএমএফের সাফল্য কীভাবে মাপা উচিত?
আইএমএফের সাফল্য মাপা উচিত একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দিয়ে শুধু নয়, তার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন কতটা ভূমিকা রাখল, তা দিয়ে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ঋণ কর্মসূচি যদি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বদলে শুধু পুরোনো ঋণ শোধের ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
১৯৭১ সালের চেতনা আমাদের শেখায়, নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নিতে। সেই চেতনায় আমাদের অর্থনৈতিক নীতিও হতে হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম। আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় আমাদের দর কষাকষির ক্ষমতা থাকতে হবে, যেন কোনো শর্তই আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী না হয়।
মার্তিন গুজমান আর্জেন্টিনার সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং জোসেফ ই স্টিগলিৎস অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ