পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, র্যাবের নতুন রূপ: জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস। আজকের সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত খবরগুলোতে সেই চেতনা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যানের আকস্মিক পদত্যাগ, র্যাবের নাম বদলে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ, এবং ভরা মৌসুমে সারের তীব্র সংকটসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আজকের পত্রিকার শিরোনামে স্থান পেয়েছে। এই খবরগুলো আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রার পথে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে।
পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ কেন ঘিরে এত কৌতূহল?
দৈনিক মানজমিনের শিরোনাম 'কেন পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, নানা কৌতূহল'। খবরে বলা হচ্ছে, মেয়াদের অর্ধেক পার হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেম। গতকাল দুপুরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসিতে বহুমুখী সংস্কারে হাত দিয়েছিলেন তিনি। তার বেশ কিছু উদ্যোগ সফল হয়েছে। পরীক্ষাজট কমিয়েছেন, পরীক্ষা পদ্ধতির জটিলতাও কমেছে। আগে প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও তার সময়ে এমন অভিযোগ মেলেনি।
পিএসসি সূত্র জানিয়েছে, তার এই কার্যক্রমের কারণে সুবিধাবাদী মহল একের পর এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছিল। বলা হচ্ছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেটের তৎপরতার কারণে কিছুদিন ধরে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার এক ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। মোবাশ্বের মোনেম পিএসসির পুরো স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছিলেন, যা কর্মকর্তারা ভালোভাবে নেননি।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের নামে গোপন কারাগার: জাতির জন্য লজ্জার বিষয়
দৈনিক যুগান্তরের শিরোনাম 'মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র: গা শিউরে ওঠা সদর অন্দর ভয়ংকর গোপন কারাগার'। দেশজুড়ে পাঁচ শতাধিক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যার বেশির ভাগই সাইনবোর্ডসর্বস্ব। ন্যূনতম চিকিৎসার বালাই নেই, উল্টো দিনের পর দিন বন্দি রেখে চলে মারধর। পৈশাচিক কায়দায় মধ্যযুগীয় নির্যাতনের অভিযোগও ভূরিভূরি। চুটিয়েচলে মাদক ব্যবসাও। রোগী ভর্তির পর নানা অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয়।
এমনকি রোগীকে সুস্থ করে তোলার নামে অভিভাবকদের মাদক কেনার টাকা দিতেও বাধ্য করা হয়। বেশির ভাগ কেন্দ্রের প্রধান টার্গেট অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে শুরু করে সম্পত্তির বিরোধে ভাড়া খাটে নিরাময় কেন্দ্রের বিশেষ টিম, যাদের নাম 'ক্যাচিং পার্টি'। টাকার বিনিময়ে ভালো মানুষকেও মাদকাসক্ত সাজিয়ে তারা বন্দি করে রাখে। ফলে নিরাময় কেন্দ্র নামের এসব প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে একেকটি গোপন কারাগার।
র্যাবের নতুন নামকরণ: প্রকৃত সংস্কার নাকি কৌশলগত পরিবর্তন?
প্রথম আলোর শিরোনাম 'র্যাব কাগজেই বিলুপ্ত, থাকছে নতুন নামে'। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গোপন বন্দিশালা পরিচালনার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে র্যাবের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনসহ বিভিন্ন মহল থেকে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার দাবি ও সুপারিশ এসেছিল। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপিও সংবাদ সম্মেলন করে র্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছিল।
অথচ সেই বাহিনীকে বিলুপ্ত না করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি নামে রেখে দেওয়া হচ্ছে। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬'-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর আওতায় এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হবে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কাগজে 'র্যাব' বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার প্রায় সবই থাকছে। র্যাবের বর্তমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, নথি ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে চলে যাবে। র্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।
ভরা মৌসুমে সার সংকট: কৃষকের দুর্ভোগ ও সরকারি বক্তব্যের ফারাক
নয়াদিগন্তের শিরোনাম 'ভরমৌসুমে তীব্র সারসঙ্কট'। আমন রোপণের ভরা মৌসুমে একদিকে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের ব্যস্ততা, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে তাদের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় সার। সারের দাবিতে লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভে নামতে দেখা গেছে।
অথচ কৃষি বিভাগ থেকে দাবি করা হচ্ছে দেশে সারের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের এই বাস্তবতার সাথে সরকারি বক্তব্যের বড় ধরনের ফারাক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আমনের পরপরই শুরু হবে রবি ও বোরো মৌসুম। ফলে আগামী মার্চ পর্যন্ত দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি: গণতন্ত্রের শিকড় মজবুত করার সময়
কালের কণ্ঠের শিরোনাম 'স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি'। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রত্যাশিত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বৈঠক করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ভোটের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, ইসি চলতি অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠান ইউপি, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার কর্মপরিকল্পনা করছে। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স: বিপুল সম্পদ থাকলেও সেবায় ঘাটতি
বণিক বার্তার শিরোনাম '১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে তিন তারকা এয়ারলাইনস বিমান'। প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের। কিন্তু সেই শক্তির যথাযথ প্রতিফলন নেই যাত্রীসেবা ও পরিচালন দক্ষতায়। বিপুল সম্পদ ও আধুনিক ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের বহর থাকার পরও যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাইট্র্যাক্সের সর্বশেষ মূল্যায়নে বিমান পেয়েছে 'থ্রি স্টার' রেটিং। সংস্থাটির আছে বড় দেনাও, যার পরিমাণ ১৩ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা।
দ্য ডেইলি স্টারের শিরোনাম 'COVID ERA CARGO FLIGHTS: Biman failed to collect Tk 886cr in revenue'। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পরিচালিত চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইটের ক্ষেত্রে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রায় ৮৮৬ কোটি টাকা হারিয়েছে। করোনা মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন যখন স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটি তাদের অব্যবহৃত যাত্রীবাহী বিমানগুলোকে অস্থায়ী কার্গো বিমানে রূপান্তর করে এসব ফ্লাইট চালু করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর্থিকভাবে লাভজনক না হয়ে দায় বা বোঝা হয়ে দাঁড়াল।
স্বাস্থ্যখাতের সংকট: হামে মৃত্যু বাড়ছে, প্রশিক্ষণহীন চিকিৎসক
আজকের পত্রিকার শিরোনাম 'হামে মৃত্যু আবার ঊর্ধ্বমুখী'। দেশে গত পাঁচ মাসে হাম এবং এর উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে নয় শর বেশি মানুষ। মৃতদের বেশির ভাগ শিশু। হামের প্রকোপ ঠেকাতে নেওয়া বিশেষ কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে মৃত্যু কমলেও এই নিম্নমুখী ধারা স্থায়ী হয়নি। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আবার মৃত্যু বাড়তে শুরু করে।
সমকালের শিরোনাম '২৩৫ কোটি টাকার ইনস্টিটিউট, প্রশিক্ষণ পাননি একজনও'। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষ করে তুলতে ২৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট (বিআইএইচএম)। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভবনগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অথচ আজ পর্যন্ত এখানে কোনো চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। চালু করা যায়নি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।
প্রশাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি: বাস্তবায়নে কেন ব্যর্থতা?
নিউ এইজের শিরোনাম 'Most reform pledges for admin ignored'। ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাসের মাথায় জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্ত মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের দ্বারা বেশি প্রভাবিত বলে মনে হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পর, প্রত্যাশা ছিল ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে ওঠা নতুন প্রশাসন অতীতের ধারা থেকে বেরিয়ে আসবে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে একটি 'জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন' গঠন করেছিল। মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে এর অধিকাংশ সুপারিশের বিষয়ে বিএনপি নিজেও সম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি তা বাস্তবায়ন করেনি।
জাতীয় স্বার্থে সংবাদপত্রের ভূমিকা: সচেতনতা ও জবাবদিহিতার দাবি
আজকের সংবাদপত্রগুলোর খবরগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেছে যে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমাদের জাতীয় জীবনে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের আদর্শকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সংবাদমাধ্যমের এই অনুসন্ধানী ও সাহসী প্রতিবেদনগুলো জাতিকে সচেতন করে তুলছে এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনছে।
মুক্তির বার্তা হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, জাতির অগ্রযাত্রায় কোনো বাধাই স্থায়ী নয়। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, সততা ও দেশপ্রেমই পারে সব সংকট কাটিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে আমাদের সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে।