জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য আগামী শনিবার খুলনা বিভাগ অভিমুখে লংমার্চ করছে, আর এই বহরে এক হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে বলে আশা করছেন সংগঠনটির নেতারা। কুষ্টিয়ার সমাপনী সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের সমাগমের প্রত্যাশাও তাঁরা পোষণ করছেন। চট্টগ্রাম ও রংপুরের পর এটি হচ্ছে ঐক্যের তৃতীয় লংমার্চ।
সাত দফা দাবি সামনে রেখে এই কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। পথসভা ও সমাবেশের স্থানগুলোতে মঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছে, পাশাপাশি চলছে প্রচারপত্র বিতরণ ও গণসংযোগ।
লংমার্চের পথ ও কর্মসূচি
১১-দলীয় ঐক্যের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাতটায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটক থেকে লংমার্চের উদ্বোধন হবে। এতে নেতৃত্ব দেবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রথম আলোকে জানান, ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চের পথে ১৯টি জেলা পড়েছে। লংমার্চ নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রেঞ্জ ডিআইজিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনায় প্রবেশের আগেই বহরে এক হাজার গাড়ি যুক্ত হতে পারে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আশাও করছেন তাঁরা।
ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে মাদারীপুর-শরীয়তপুরের মাঝামাঝি নাওডোবা দিয়ে গাড়িবহর খুলনা বিভাগের দিকে যাবে। পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা হবে। এরপর কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রস্তুতি প্রায় শেষ: কুষ্টিয়ার সমাবেশ
কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল গফুর বলেন, সমাবেশের মঞ্চ নির্মাণসহ প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রচার চালানো হয়েছে। কুষ্টিয়ার সমাপনী সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি আশা করছেন তাঁরা।
এর আগে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠে সমাবেশের পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রশাসন আট শর্তে শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
খুলনায় স্থানীয় পর্যায়েও ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা মেইলের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে খুলনা মহানগরী জামায়াতের আমির মাওলানা মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, শিববাড়ী ও ফুলতলায় পথসভার আয়োজন থাকছে। ঢাকা থেকে আসা বহরে পাজেরো, হাইয়েস ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের এক হাজারের বেশি গাড়ি থাকতে পারে বলেও তিনি জানান। সময়ের আলোর প্রতিবেদনেও একই তথ্য এসেছে।
গোপালগঞ্জ পেরিয়ে খুলনা: নিরাপত্তার প্রশ্ন
লংমার্চের পথ গোপালগঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা গোপালগঞ্জে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর এবার লংমার্চ ঘিরেও কেউ কেউ সংঘাতের আশঙ্কা করছেন।
তবে ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা বিষয়টিকে আশঙ্কা হিসেবে দেখছেন না। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গোপালগঞ্জ বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সেখানে বিরোধী দলের লংমার্চ ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে। এ কারণে বিরোধী দলের কর্মসূচিতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, খুলনা-কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চে আগের দুই কর্মসূচির তুলনায় গাড়িবহর ও মানুষের উপস্থিতি বেশি হতে পারে।
সাত দফা দাবি: জনগণের রায়ের প্রশ্ন
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি সামনে রেখে এই লংমার্চ করছে ১১-দলীয় ঐক্য। তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা।
১১ দলের নেতাদের বক্তব্য, সরকার গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর প্রতিবাদেই রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করছেন তাঁরা। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ও ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করে ঐক্য। খুলনা বিভাগের কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনপিবি নিউজের প্রতিবেদনে খুলনায় ঐক্যের প্রেস ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত এসেছে।
জনগণের ম্যান্ডেট ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
এই লংমার্চ কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। এটি জনগণের ভোট ও রায়ের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলে ধরছে। ১৯৭১ সালে এই ভূখণ্ডের মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধিকার অর্জন করেছিল; সেই চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে গণভোটের রায় উপেক্ষা করা মানে জনগণের সার্বভৌম অধিকারকেই অস্বীকার করা। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল ভিত্তি জনগণের ম্যান্ডেট, আর সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের লড়াই আজও অসমাপ্ত।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎ, সার, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। খুলনা বিভাগ একসময় এই দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্পদ ছিল, আজ সেখানেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট ক্রমাগত বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটেই লংমার্চের বাহনে মানুষের ক্ষোভ রাজপথে নামছে।
শনিবারের কর্মসূচি কতটা সাড়া পায়, সেটি নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর। আয়োজকদের ভাষ্য, আগের দুটি লংমার্চের তুলনায় এবার তাঁরা বেশি সাড়া পাচ্ছেন। কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামের সমাপনী সমাবেশ হবে এই কর্মসূচির চূড়ান্ত পরীক্ষা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
খুলনা অভিমুখে লংমার্চ কবে হচ্ছে?
আগামী শনিবার সকাল সাতটায় ঢাকার বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটক থেকে লংমার্চ শুরু হবে, আর কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ হবে।
লংমার্চে কত গাড়ি যুক্ত হতে পারে?
জামায়াতের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনায় প্রবেশের আগেই বহরে এক হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে।
১১-দলীয় ঐক্যের প্রধান দাবি কী?
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার, গণহত্যার বিচার এবং জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এই ঐক্যের অন্যতম দাবি।
গোপালগঞ্জ অতিক্রমে নিরাপত্তার আশঙ্কা আছে কি?
আগে ওই জেলায় বিরোধী নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলেও ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।
