আট দফা এক দফা হতে পারে: ১৯৭১-এর চেতনায় শফিকুর রহমানের হুঁশিয়ারি
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে শনিবার সকালে রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ১১ দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবি যেকোনো সময় এক দফায় রূপ নিতে পারে, যা হবে জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড়।
শফিকুর রহমানের হুঁশিয়ারি: দাবি মেনে না নিলে পরিণতি কী?
সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের আট দফা, নয় দফা, দশ দফায় পরিণত হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটি এক দফায় পরিণত হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দলের আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সরকার যেন সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নেয় এবং জনগণের দাবি মেনে নেয়।
''আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ ১১ দলের সঙ্গে আছে। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশাল্লাহ।''
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ সফল হওয়ায় অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। এর কিছু লক্ষণ গত দুই দিন ধরে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে। তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা যেন হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনতার দাবি মেনে নেয়।
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ: রংপুরে নতুন দাবি সংযোজন
৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চে ছয় দফা দাবি সামনে রেখেছিল ১১ দল। দাবিগুলো ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
রংপুরের কর্মসূচিতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির বিষয়গুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের একটি আঞ্চলিক ইস্যুকেও সামনে এনেছে জোট। জোটের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের মানুষের দাবিকে বিবেচনায় নিয়েই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে।
সামনে আরও দুটি লংমার্চ: খুলনা ও সিলেট
১১-দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ হবে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা ও সিলেট, দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের দিকে ধারাবাহিক লংমার্চের কর্মসূচি নিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্য।
১১-দলীয় ঐক্যের সূত্রগুলো বলছে, লংমার্চ ও সমাবেশ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দাবিগুলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি জুলাই সনদ মেনে সংবিধান সংস্কারে সরকারকে চাপেও রাখার বিষয়টিও আছে। লংমার্চ কর্মসূচি শেষ করে ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্য। তবে জোটের সূত্র বলছে, ঘোষিত চারটি লংমার্চ কর্মসূচি শেষে আরও কিছু বিভাগীয় শহরে লংমার্চ হতে পারে।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চে দেশব্যাপী জোয়ার তৈরি হয়েছে। তাই সরকার সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন কথা বলছে। বিরোধী দলের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হবে বলে জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন ও লড়াই চলবে।
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ও দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম।
আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রমুখ।
১৯৭১-এর চেতনা ও বর্তমান সংগ্রাম
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি যে আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই চেতনাই আজকের এই আন্দোলনের প্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যেমন এক দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম, আজও জনগণের দাবি এক দফায় পরিণত হলে সরকারকে তার মুখোমুখি হতে হবে। জাতির স্বার্থে, জনগণের অধিকার আদায়ে এই লংমার্চ মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই ধারাবাহিকতা।
বাংলার মাটিতে যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, তা ইতিহাস সাক্ষী। আজকের এই লংমার্চও সেই ঐতিহ্যেরই অংশ। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন এবং একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।