দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশে জমির নিবন্ধন চলছে হাতে-লেখা দলিল আর বালাম বহির পুরোনো পদ্ধতিতে, অথচ নামজারি প্রায় এক যুগ আগেই অনলাইনে চলে গেছে। প্রথম আলোর একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, এই দ্বৈততার সর্বোচ্চ মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ ভূমিমালিকরা, যাঁরা সারাজীবনের সঞ্চয় ঢেলে জমি কিনেও নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন না।
১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়েছিলাম, যার প্রতিশ্রুতি ছিল ন্যায্য রাষ্ট্র ও জনগণের সেবা। কিন্তু আজ, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও, দেশের প্রতিটি উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় যেন ইচ্ছা করেই অতীতে আটকে আছে। প্রশ্ন হলো, এই 'মান্ধাতা-প্রীতি' আর কত দিন, আর এতে কার লাভ?
বালাম বহি আর হাতের লেখা: একুশ শতকে পৌরাণিক আমল
সরকারি দপ্তরগুলোতে এখন আর হাতে-লেখা কাগজ তেমন চলে না। গ্রামের সাধারণ মানুষও আবেদনপত্র টাইপ করে জমা দেন। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে আজও দলিলের নকল উঠতে হয় এমন হাতের লেখায়, যা অনেক সময় পড়াই যায় না। কার্বন কাগজের যুগ ফুরিয়ে গেছে, গ্রামের দোকানেও এখন ফটোকপি মেশিন পাওয়া যায়, অথচ নিবন্ধিত দলিলের কপি একজন দেখে দেখে বালাম বহিতে তোলেন, আরেকজন পাঠ করেন, তৃতীয়জন যাচাই করেন। মূল দলিল পেতে সময় লাগে কয়েক বছর।
একটি দেশ, একটি সেবা, কিন্তু দুই যুগের পার্থক্য। ভূমি ব্যবস্থাপনায় নামজারি প্রায় দশ বছর ধরে অনলাইনে হচ্ছে। শত বছর আগের রেকর্ডও এখন জুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘরে বসেই অনলাইনে খতিয়ান অনুসন্ধান করে বের করা যায়। নামজারি আবেদন ও ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যায় পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে, এমনকি আবেদনটি কার কাছে কত দিন অনিষ্পন্ন আছে সেটিও মুহূর্তেই জানা যায়। অথচ দলিল নিবন্ধন আজও কাগজের স্তূপে আটকে।
কেন এই দ্বৈততা, কার স্বার্থ এতে জড়িত?
জমি কিনতে গেলে ক্রেতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: জমিটি আগে কি অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে? নামজারি না হলে এই তথ্য সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় ছাড়া আর কোথাও নেই। দলিলের পাতা উল্টে উল্টে সেই তথ্য খুঁজে বের করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আর সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ৩ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিলকেই নোটিশ গণ্য করা হয়। অর্থাৎ জমি আগেই বিক্রি হয়ে থাকলে সেটি না জানার দায় পুরোপুরি নতুন ক্রেতার।
এই দায় নিয়েই হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভূমিমালিকরা। সারাজীবনের সঞ্চয় ঢেলে জমি কিনলেন, দেখলেন দুই দিন আগেই সেটি অন্য কারো কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। ৫০ বছর আগের দলিলে বাবার জমি ছিল, কিন্তু বালাম বহি ঘষামাজা করে দাগ নম্বর বদলে দেওয়া হয়েছে। ২৪ আপডেট নিউজের প্রতিবেদনেও সতর্ক করা হয়েছে, দলিলে জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, খতিয়ান বা মৌজার নামের সামান্য ভুলও ভবিষ্যতে বড় আইনি জটিলতা ডেকে আনে।
প্রথম আলোর তথ্য: ৭৯ শতাংশ আবেদনে ত্রুটি
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০২৩ সালের ১৪ মে-র একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। গাইবান্ধা সদর উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রেজাউল করিম ১০ হাজার ২১৪ জন নামজারি আবেদনকারীর মধ্যে জরিপ চালান। ফলাফল: দলিলে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি বিক্রি ১৫ শতাংশ, শ্রেণির ভুল ১১ শতাংশ, দাগের ভুল ৬ শতাংশ, খতিয়ান নম্বরের ভুল ২ শতাংশ, দাতার নামে ভুল ৩ শতাংশসহ মোট ৭৯ শতাংশ আবেদনকারীর কাগজপত্রে ত্রুটি রয়েছে।
এই বিপুল ত্রুটির মূল কারণ পরিষ্কার: দলিল নিবন্ধন ও নামজারি, একই সেবার দুটি অংশ, একই প্ল্যাটফর্মে নেই। দুই দপ্তরের মাঝে তথ্যের দেয়াল তুলে ধরেছে এমন এক শ্রেণির স্বার্থবাদী মহল, যাঁরা এই বিভ্রান্তির ওপর টিকে থাকা দালালি, দলিল লেখক ও তদবিরের বাজার চালান। নিবন্ধন ও নামজারি একই প্ল্যাটফর্মে এলে তাঁদের তথ্য সহজে প্রকাশ পেয়ে যাবে, তাঁদের 'ক্ষতি' হবে ঠিকই, কিন্তু উপকৃত হবেন সাধারণ জনগণ।
ব্যর্থ প্রকল্প, নতুন প্রতিশ্রুতি
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ২০২১ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় ১৭টি উপজেলায় পাইলট হিসেবে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই সফটওয়্যার প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ, প্রকল্পের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরাও আর নেই। সম্প্রতি আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্প কেন ব্যর্থ হলো, সেই কারণ অনুসন্ধান না করেই নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া মানে একই ফাঁদে দ্বিতীয়বার পা রাখা।
বিকল্পও আছে। অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে দলিল লেখক ও বালাম লেখকদের ইতোমধ্যে চালু হওয়া ল্যান্ড সার্ভিস ফ্যাসিলিটেটিং সেন্টারের (LSFC) মতো লাইসেন্স দিয়ে আলাদা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আর সিস্টেম না বদলালে শুধু লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি দিয়ে হয়রানি কমবে না; বরং কম দক্ষ কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
জনগণের রাষ্ট্রে জমির সেবা জনগণের অধিকার
ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়্যাব তাঁর 'দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন' গ্রন্থে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের সুফল থেকে পৃথিবীর বিপুল মানুষ বঞ্চিত। কিন্তু একই দেশে, একই সেবার মধ্যে এমন দ্বৈততা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়। ভূমি মন্ত্রণালয় একটি প্ল্যাটফর্মে নামজারি ও নিবন্ধন একীভূত করার বিষয়টি এখনই পর্যালোচনা করা উচিত।
ছোট এই দেশে বিপুল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ভর করে সীমিত ভূমির ওপর। যে ভূমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, যে মাটির জন্য লাখো শহিদ প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই মাটির সেবাও হওয়া উচিত শহিদের প্রত্যয়ে: স্বচ্ছ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত। মূল দলিল পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা, হাতের লেখা নকল, অদৃশ্য হস্তান্তরের ভয়, তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতা; এই অবস্থা চলতে দিলে জমির নিবন্ধনে চলা 'মান্ধাতা-প্রীতি'র দায় ইতিহাস সরকারকেই বহন করতে বাধ্য করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
জমির নিবন্ধন কি এখন অনলাইনে হয়?
না। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১৭টি উপজেলায় পাইলট হিসেবে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু হলেও সেই সফটওয়্যার প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধন এখনো পুরোনো হাতে-লেখা পদ্ধতিতে হচ্ছে।
নামজারি কী এবং কেন জরুরি?
দলিল নিবন্ধনের পর সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম যুক্ত করাই নামজারি। এটি না হলে জমি আগে কারো কাছে হস্তান্তর হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দলিলে ভুল থাকলে কী ঝুঁকি আছে?
গাইবান্ধার এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ নামজারি আবেদনে কোনো না কোনো ত্রুটি ছিল। দাগ নম্বর, খতিয়ান বা শ্রেণির ভুল ভবিষ্যতে দীর্ঘ আইনি জটিলতা তৈরি করে।
