দেশের প্রায় ২৮ বছরের পুরোনো তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এখনো বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঞ্চয়ের হাতিয়ার। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সঞ্চয়পত্র দেশের প্রতিটি নাগরিক কিনতে পারেন এবং প্রতি তিন মাস পরপর মুনাফার টাকা তুলতে পারেন। মুনাফার হারও পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের কাছাকাছি।
স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সঞ্চয় ব্যবস্থা শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সাধারণ মানুষের সংসার চালানোর ভরসা। যে দেশ ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক আর অবসরপ্রাপ্ত জনতার সঞ্চয় রাষ্ট্রেরই দায়িত্বে রক্ষিত। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র সেই দায়িত্বেরই প্রতিফলন, কারণ এটিকে বলা চলে দেশের একমাত্র সর্বজনীন সঞ্চয়পত্র।
কারা কিনতে পারবেন
পরিবার সঞ্চয়পত্র মূলত নারীদের জন্য, পেনশনার সঞ্চয়পত্র অবসরপ্রাপ্তদের জন্য। কিন্তু তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে এমন বাধা নেই। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক এটি কিনতে পারবেন। এছাড়া স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল, মৎস্য খামার, গবাদিপশুর খামার, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের খামারের মতো কৃষিভিত্তিক আয়ও এতে বিনিয়োগ করা যাবে, যদি সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার তা প্রত্যয়ন করেন। অটিস্টিকদের সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান, দুস্থ ও অনাথ শিশুদের নিবন্ধিত আশ্রয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রবীণদের নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্রও ক্রেতা হতে পারবে। তবে অটিস্টিক সহায়ক প্রতিষ্ঠানকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে এবং মুনাফা অবশ্যই অটিস্টিকদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
মুনাফার হার ও মেয়াদ কত
সঞ্চয়পত্রটির মেয়াদ তিন বছর। ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকার এই সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্ণ করলে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্ণ হলে হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। মেয়াদের আগে ভাঙালে মুনাফা কমে যাবে, আর আগে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হলে তা মূল টাকা থেকে কেটে রাখা হবে।
কোথায় কিনবেন, কত টাকা বিনিয়োগ করা যাবে
জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে এই সঞ্চয়পত্র কেনা ও ভাঙানো যায়। ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সীমা একক নামে ৩০ লাখ টাকা, যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকা। ভবিষ্য তহবিলের ক্ষেত্রে মোট স্থিতির ৫০ শতাংশ পর্যন্ত, তবে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা। ফার্মের সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা। অটিস্টিক সহায়ক প্রতিষ্ঠান, অনাথ আশ্রম, শিশু পরিবার, এতিমখানা ও প্রবীণদের আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা।
কর ও রিটার্নে মুনাফা দেখানোর নিয়ম
আয়কর আইন-২০২৩-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী মুনাফার ওপর অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) থাকলে কর ১০ শতাংশ, না থাকলে ১৫ শতাংশ। এ বছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর চূড়ান্ত করদায়ের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, ফলে অগ্রিম করের টাকা রিটার্ন জমার সময় সমন্বয় করা যাবে। দাউদBD-র প্রতিবেদন জানাচ্ছে, অনলাইন ই-রিটার্নে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার তথ্য Income from Financial Assets অংশে দেখাতে হয় এবং কর রেয়াতের সুযোগও আছে।
সঞ্চয়ের সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার চেতনা
আমাদের জাতির ইতিহাসে সঞ্চয় কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের ব্যাপার একা ছিল না। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া জাতি, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী জাতি, সেই জাতি নিজের পরিশ্রমের ফল রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়পত্রে রাখলে সেই সম্পদ দেশেই থাকে। বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ ফার্মে নয়, দেশের মাটিতেই কাজ করে। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র সেই সার্বভৌম অর্থনীতিরই একটি স্তম্ভ।
আজকের আর্থিক বাস্তবতায় বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন যেমন দেখাচ্ছে, মাস শেষে বেতন ফুরিয়ে গেলেও ছোট অঙ্কে নিয়মিত সঞ্চয়ের পথ আছে। সিটিজেনস ভয়েসের পরামর্শ হলো, জরুরি তহবিলের জন্য সহজে তোলা যায় এমন হিসাব আর দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের জন্য উপযুক্ত সঞ্চয়পণ্য বেছে নেওয়া। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র দুই দাবিই পূরণ করে, কারণ প্রতি তিন মাসে নিয়মিত মুনাফা হাতে আসে।
অতিরিক্ত সুবিধা
- তিন মাস পরপর মুনাফা উত্তোলন করা যায়।
- নমিনি নিয়োগ করা যায়; ক্রেতার মৃত্যুর পর নমিনি সঙ্গে সঙ্গে নগদায়ন করতে পারেন অথবা মেয়াদ শেষ পর্যন্ত প্রতি তিন মাসে মুনাফা তুলতে পারেন।
- মেয়াদপূর্তির আগে ইস্যু অফিসে যোগাযোগ করে স্বয়ংক্রিয় পুনঃবিনিয়োগের সুবিধা নেওয়া যায়।
উল্লেখ্য, সমাজের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন তোলেন। আত-তাহরীকের এক প্রশ্নোত্তরে বলা হয়েছে, সরকারি সঞ্চয়পত্রের লাভ সুদের অন্তর্ভুক্ত। ক্রেতাদের নিজ নিজ বিবেক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকল, তবে আইনগতভাবে এটি রাষ্ট্র পরিচালিত সঞ্চয় ব্যবস্থার অংশ।
প্রশ্নোত্তর
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ কত?
মেয়াদ তিন বছর। মেয়াদের আগে ভাঙালে মুনাফার হার কমে যায়।
একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কত টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন?
একক নামে ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকা।
মুনাফা কত হারে পাওয়া যায়?
সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্ণ করলে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ, এর বেশি হলে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
কোথা থেকে এই সঞ্চয়পত্র কেনা যায়?
জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে।
