মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি পয়সা জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত। কিন্তু সিলেটে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালটি আজও প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ১৯৭১-এর চেতনা আমাদের শেখায়, প্রতিটি সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে হবে জাতির অগ্রযাত্রায়। সেই শিক্ষা কি আমরা ভুলে গেছি?
গত ১৮ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালের ভেতরে ক্রিকেট খেলছেন স্থানীয় তরুণেরা। ৪৫০টি ট্রাক রাখার সক্ষমতা থাকলেও সেখানে জমে আছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪টি ট্রাক। বাকি বিশাল জায়গা পড়ে আছে অনাবাদি মাঠের মতো।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত, আজ পরিত্যক্ত
২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর উদ্যোগে শুরু হয় টার্মিনালটির নির্মাণকাজ। ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর উদ্বোধনের পর থেকেই এটি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, চালকদের বিশ্রামাগারসহ সবকিছু করা হয়েছে। কিন্তু দূরবর্তী অবস্থানের কারণে চালকেরা আসছেন না।
দক্ষিণ সুরমার পারাইরচক এলাকায় অবস্থিত এই টার্মিনালটি শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে ৮ থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে। আশপাশে নেই কোনো বসতি, নেই রেস্তোরাঁ বা আবাসনের ব্যবস্থা। নিরিবিলি এই এলাকায় ট্রাক রেখে চালকেরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
জাতীয় সম্পদের অপচয়: কারা দায়ী?
প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করে যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হলো, তা কেন সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ব্যর্থ হলো? স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমরা কি পরিকল্পনার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারিনি?
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, টার্মিনালটি শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় চালকেরা সেখানে ট্রাক পার্ক করতে চান না। কীভাবে এটি কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে।
টার্মিনালের ইজারাদার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কোনো দিন ১৩ থেকে ১৪টি, কোনো দিন ২০টি ট্রাক আসে। বছর শেষে হিসাব করে দেখা যাবে লাভ-লোকসান কত। তবে খুব বেশি ট্রাক আসে না।
সড়কে যানজট, টার্মিনালে ফাঁকা জায়গা
নগরের কালীঘাট পাইকারি বাজার, কিনব্রিজ এলাকা, সোবহানীঘাট সবজি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখেন চালকেরা। এতে যানজট ও দুর্ভোগ বাড়ছে। অথচ কেন্দ্রীয় টার্মিনালটি সেই চাপ কমাতে ব্যর্থ।
সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দেব বলেন, আগে ইজারাদারেরা নগরের বিভিন্ন সড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাক থেকে টাকা আদায় করতেন। এখন সেই সুযোগ বন্ধ। ফলে ইজারাদারেরা আগের মতো বেশি টাকায় টার্মিনাল ইজারা নিচ্ছেন না।
টার্মিনালের ভবিষ্যৎ: করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনালটি চালু করতে হলে চালকদের জন্য আবাসন, খাবারের ব্যবস্থা এবং শহরের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগের প্রয়োজন। পাশাপাশি টার্মিনালের বাইরে ট্রাক পার্কিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
স্বাধীনতার চেতনা আমাদের শেখায়, নিজের সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতেই হবে। ১৯৭১ সালে আমরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সেভাবেই এই জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। ১৯ কোটি টাকার প্রকল্প অকার্যকর থাকলে তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, জাতির আত্মমর্যাদারও ক্ষতি।
আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি জাতীয় সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই তো সার্থক হবে ১৯৭১-এর আত্মত্যাগ।
