বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে এখন শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬৩ শতাংশই নারী। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৫ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এই তথ্য দেশের অর্ধশতাব্দীর পরিবর্তনের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। যে জাতি ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই জাতির কন্যারাই আজ দেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করছেন।
ব্যানবেইসের এই পরিসংখ্যান সর্বপ্রথম প্রথম আলোর প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১০৯টি সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ২০২৫ সালে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫১ হাজার ৩১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশই ছাত্রী।
সরকারি-বেসরকারি সব মেডিক্যাল কলেজেই নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ
সরকারি ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজে মোট শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ নারী। বেসরকারি ৭২টি মেডিক্যাল কলেজে এই হার আরও বেশি, ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। মানে, চিকিৎসক হওয়ার পথে মেয়েরা এখন সংখ্যার দিক থেকে যেমন এগিয়ে, তেমনি মেধার দিক থেকেও অগ্রসর।
এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকদের মধ্যেও নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ৪৮ হাজার ৭৭৭ জন এমবিবিএস পাস করেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ হাজার ৯০১ জন নারী, যা মোট উত্তীর্ণদের প্রায় ৫৫ শতাংশ। এই ধারা কমপক্ষে আট থেকে দশ বছর ধরে অব্যাহত।
ডেন্টাল ও নার্সিংয়েও নারীরাই এগিয়ে
শুধু এমবিবিএস নয়, চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শিক্ষায়ও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। দেশের ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিটে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ নারী।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় এই ব্যবধান আরও বিশাল। দেশের ৪৭৫টি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ ও ইনস্টিটিউটে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই ছাত্রী। দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি যে মানুষগুলোর হাতে, তাঁদের নিয়ত এই পরিসংখ্যান তা স্পষ্ট করে।
শিক্ষায় অগ্রগতির পেছনে কী কাজ করছে?
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের এই অগ্রযাত্রা আকস্মিক কিছু নয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ইতিমধ্যেই ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পাবলিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফলের সূচক জিপিএ-৫ অর্জনেও মেয়েরা এগিয়ে। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় মেধাবী ছাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে আসছেন।
চিকিৎসক হওয়ার প্রতি মেধাবী ছাত্রীদের ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পরিবারগুলোর উৎসাহও এখানে ভূমিকা রাখছে। আমাদের সমাজে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন একটি সুখবর, যদিও শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও সনদের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, যেমনটা তুলে ধরেছে সিটিজেনস ভয়েসের এক বিশ্লেষণ।
কর্মক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে নারী চিকিৎসকরা
শিক্ষায় যত এগিয়ে, কর্মক্ষেত্রে তত নয়। ৩৯তম (বিশেষ) বিসিএসে সরকারি কর্ম কমিশন ৬ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসকের নিয়োগ সুপারিশ করে। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৫৩ শতাংশ, নারী ৪৭ শতাংশ। অথচ এই পরীক্ষায় আবেদনকারীদের ৫৬ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী। ৪২তম (বিশেষ) বিসিএসেও একই চিত্র: ৪ হাজার নিয়োগ সুপারিশের মধ্যে নারী ৪৯ শতাংশ, অথচ আবেদনকারীদের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রীদের পড়াশোনায় ভালো করা এবং এগিয়ে যাওয়া ইতিবাচক দিক। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতেই তাঁরা মেডিক্যালে ভর্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছেন। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে।
মফস্সল এলাকায় কর্মপরিবেশ ও বাস্তবতার কারণে নারী চিকিৎসকদের নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষায়িত শাখায় সীমাবদ্ধতা
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও আইসিডিডিআরবির গবেষকদের এক গবেষণায় ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিএমডিসিতে নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। নিবন্ধিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী। কিন্তু পুরুষ চিকিৎসকদের ৮৭ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা মেডিসিন ও সার্জারিতে, আর নারী চিকিৎসকদের ৯৬ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা গাইনি ও প্রসূতিরোগে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্লজ ওয়ান জার্নালে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়।
অর্থাৎ শিক্ষায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এসেছে, কিন্তু পেশার বিচিত্র শাখায় সেই বৈচিত্র্য এখনো আসেনি। আবদুল হামিদের মতে, চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত শাখায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার দাবি রাখে। সব দিক বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
স্বাধীন বাংলাদেশের কন্যাদের এই অর্জন কী বোঝায়
১৯৭১ সালে যখন আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়ছিলাম, তখন স্বপ্ন ছিল এমন এক দেশের, যেখানে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ পাবে। ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি ধাপে নারীরা ছিলেন আমাদের পাশে। সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশের কন্যারা মেডিক্যাল কলেজের আসন পূর্ণ করছেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভার কাঁধে নিচ্ছেন।
তবে সংখ্যার অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মফস্সলে পোস্টিংয়ে মানবন্দোবস্তের বাস্তবতা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ, এসব নিশ্চিত না হলে শিক্ষার এই সাফল্য পূর্ণতা পাবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দেশের নিজস্ব সম্পদ, নিজের মেধা রক্ষার ব্যবস্থা করা, যাতে এই চিকিৎসকেরা বিদেশে পাড়ি না জমিয়ে স্বদেশে সেবা দিতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন
বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রীদের হার কত?
ব্যানবেইসের শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে মোট শিক্ষার্থীর ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশ ছাত্রী।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় নারীদের অংশ কত?
দেশের ৪৭৫টি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রায় ৯০ শতাংশই নারী।
সরকারি চাকরিতে নারী চিকিৎসকদের অবস্থান কেমন?
৩৯তম ও ৪২তম (বিশেষ) বিসিএসে নিয়োগ সুপারিশে নারী চিকিৎসকদের হার আবেদনকারীদের অনুপাতে কম, যথাক্রমে ৪৭ ও ৪৯ শতাংশ।
