অবশেষে সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত কয়েক বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা ১২৫টি লাগেজ ভ্যান এবার যাত্রীবাহী বগিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। মালামাল পরিবহনে ব্যর্থতার পর এই ভ্যানগুলোকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৩ অক্টোবর রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শন করেন। ওই সফরেই লাগেজ ভ্যান যাত্রী বগিতে রূপান্তরের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এ সময় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও রেলসচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
লাগেজ ভ্যান কেন কাজে আসছিল না
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেলওয়ের বহরে যুক্ত হয় এই ১২৫টি লাগেজ ভ্যান। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে 'রোলিং স্টক সংগ্রহ' প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছিল এগুলো। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ নিয়ে চুক্তি করে রেলওয়ে।
কিন্তু বহরে যোগ হওয়ার পর থেকেই ভ্যানগুলোর বেশির ভাগই অলস পড়ে রইল। গত বছরের ৫ জানুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক সভার কার্যপত্রে উঠে আসে, ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে, ৯৫ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে।
কারণটা সহজ। রেলওয়ের কাছে 'ডোর টু ডোর' পণ্য পরিবহন সেবার সুযোগ নেই। গ্রাহককে প্রথমে পণ্য স্টেশনে নিয়ে আসতে হয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আবার সেখান থেকে সংগ্রহ করতে হয়। অথচ কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের দরজা পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দিতে পারে। ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ট্রাকেই মাল পাঠান। ফলে লাগেজ ভ্যানের প্রতি তাদের আগ্রহ কম।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে পার্সেল পরিবহন থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আয় হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরের আয় ছিল ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বিনিয়োগের তুলনায় এ আয় নিতান্তই সামান্য।
রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন কেনা ভ্যানগুলো ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর নানা চেষ্টা করা হয়েছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে; কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। এর আগে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।
রূপান্তরের পরিকল্পনা কী
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, বহরে থাকা যেসব লাগেজ ভ্যান কাজে আসছে না, সেগুলো যাত্রী পরিবহনের বগিতে রূপান্তরের চিন্তাভাবনা চলছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় ব্যবস্থাপক শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ জানান, কারখানা পরিদর্শনের সময় প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় এবং কীভাবে বগিগুলো রূপান্তর করা যেতে পারে তাও দেখানো হয়। রূপান্তরের পর এসব বগি লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। রেলওয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাজটি করবে নাকি বাইরের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে, তা-ও এখনো নির্ধারিত হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
জনগণের টাকার হিসাব দিতে হবে
১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি; কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ কেবল পতাকা নয়, জনগণের সম্পদের সুরক্ষাও। জাতির সোনালি স্বপ্ন যেন কোনো ব্যর্থ প্রকল্পের অযথা ব্যয়ে ম্লান না হয়। এডিবির অর্থায়নে কেনা এই ভ্যানগুলো নিঃসন্দেহে জনগণের করের টাকারই দায় বহন করে; তাই এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একটি দেশ তার নিজস্ব সক্ষমতায় পরিচালিত হলে সেখানে জবাবদিহিতা কঠিন হয়। সৈয়দপুরের কারখানাটি আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান; সেখানেই যদি রূপান্তরের কাজ হয়, তবে তা আমাদের জনশক্তি ও কারিগরি দক্ষতার এক সুযোগ। আশা করি, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে রেলওয়ে এবার যাত্রীসেবায় এই সম্পদটি কাজে লাগাতে পারবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশ রেলওয়ে কতগুলো লাগেজ ভ্যান কিনেছিল?
৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কিনেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এগুলো বহরে যুক্ত হয়।
লাগেজ ভ্যানগুলো কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে?
রেলওয়ের হিসাবে, ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে; ৯৫ শতাংশ অব্যবহৃত পড়ে আছে।
লাগেজ ভ্যান কীভাবে যাত্রীবাহী বগিতে রূপান্তরিত হবে?
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় রূপান্তরের প্রস্তাব দেখানো হয়েছে। রূপান্তরের পর বগিগুলো লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে; তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
