বাঙালির হৃদয়ে যাঁর সুর আজও বেজে চলে, ফকির লালন সাঁইর আবির্ভাবের ২৫২ বছর পরও তিনি কেন এত প্রাসঙ্গিক, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী। প্রথম আলোতে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধে উঠে এসেছে সেই লালন, যিনি নিছক মরমি সাধক নন, জাতপাত ও ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক অগ্রগামী মানুষ।
১৭৭৪ সালে পলাশীর যুদ্ধের ১৭ বছর পর জন্ম নেওয়া লালন (১৭৭৪-১৮৯০) বেঁচে ছিলেন নিজের চোখে দেখা এক ভাঙা সমাজে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় তাঁর সাধনা আজও হাজারো ভক্তকে টেনে আনে, আর এখনো দেশ-বিদেশে গবেষকরা তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে কাজ করছেন।
লালন কেন দ্রোহী ছিলেন
আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়, লালন একই সঙ্গে মরমি ও দ্রোহী ছিলেন। বাউলের জন্মই প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে, উচ্চবর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করে। বর্ণশাসিত সমাজের অবসান কামনা করে যে গান, সেখানে লালন লিখেছেন, লালন কয় জাত হাতে পেলে পুড়াতাম আগুন দিয়ে। এ যেন শুধু গান নয়, এক সামাজিক মুক্তির ইশতেহার।
ভারতের মধ্যযুগের সন্ত-সাধকদের মতো, কবীর থেকে দাদু পর্যন্ত, লালনও জাত-ধর্ম তুচ্ছ করেছেন। কিন্তু তাঁর স্বাতন্ত্র্য এই যে, তিনি কেবল আশ্রমে বসে দর্শন লেখেননি। কুমারখালীর কাঙ্গল হরিনাথ জমিদারের অত্যাচারের খবর ছাপার দায়ে লাঠিয়ালের হাতে বিপদে পড়লে লালন নিজে শিষ্যদের নিয়ে ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করেছেন। একতারার হাত থেকে বাঁশের লাঠি হাতে ওঠা এক সাধকের জীবনে বাংলার ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।
মানুষই লালনের ধর্ম
লালনের পদাবলির কেন্দ্রে মানুষ। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, এই বাণী যে কেবল আধ্যাত্মিক কথা নয়, তা বোঝাতে বিবিসির bdnews24 জানিয়েছে, বাউল দর্শন মূলত দেহ-কেন্দ্রিক অধ্যাত্ম সাধনা ও প্রেমাত্মক দর্শন, যা মানুষের ভেতরে মনের মানুষের সন্ধান করে। লালন নিজে জাত-ধর্মের প্রশ্নে জবাব দিয়েছিলেন, সব লোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন, লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান।
শাস্ত্র প্রসঙ্গে তিনি ছিলেন সংশয়ী। বেদে কি তার মর্ম জানে, এমন প্রশ্ন তুলে তিনি অন্ধবিশ্বাসের জায়গায় যুক্তিকে বসিয়েছেন। পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক তাঁর কাছে দেশাচার মাত্র। পরলোকের স্বর্গের চেয়ে দুনিয়ার মানুষের কল্যাণই ছিল তাঁর প্রকৃত ব্রত।
১৯৭১-এর চেতনার সঙ্গে লালনের যোগ
যে জাতি ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, ১৯৭১ সালে যে জাতি নিজের মুক্তির জন্য সর্বস্ব দিয়েছে, সেই বাঙালির চেতনায় লালনের গান কোনো দিন বিদেশি হয়ে পড়েনি। জাত-ধর্মের বিভেদ ভেঙে মানুষকে এক সুতায় বাঁধার যে দর্শন লালন দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও তার থেকে পৃথক নয়। আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের শিকড় এই মাটিতেই, লালনের সুরেই।
কিন্তু এই অমর সাধকের ওপর আঘাত এসেছে বারবার। প্রবন্ধে উঠে এসেছে, কোনো কোনো বইয়ে লালনকে নামতে হয়েছে জারজ অপবাদে। আর সম্প্রতি উগ্র শাস্ত্রবাহকেরা লালনের মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছে। বিদেশি প্রভাবে প্রকাশ্যে আসা এই অসহিষ্ণুতা আমাদের সংস্কৃতির শত্রু, এ কথা বলতে দ্বিধা করার কিছু নেই। যারা লালনকে মুছে ফেলতে চায়, তারা আসলে বাঙালির আপন মুখ মুছে ফেলতে চায়।
লোকমানসের দেয়ালী উৎসব
উনিশ শতকে রামমোহন রায়ের ডাক শুধু কলকাতার পড়ুয়া সমাজে পৌঁছেছিল। কিন্তু গ্রামের পর গ্রামে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়েছেন লালন। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায়, বাংলার নবজাগরণে রামমোহনের যে গুরুত্ব, বাংলার লোকমানসের দেয়ালী উৎসবে লালনেরও সেই গুরুত্ব। তাঁর প্রভাব কাঙ্গল হরিনাথ, মীর মশাররফ হোসেন থেকে ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত প্রসারিত।
কুষ্টিয়ায় প্রতি বছর লালন স্মরণোৎসব এখন জাতীয় উৎসবের মর্যাদা পেয়েছে। সদ্য সমাপ্ত এবারের স্মরণোৎসবেও ভক্তরা মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি বাণী ধারণ করে সত্যের সন্ধানে মিলিত হয়েছেন, একথা জানিয়েছে দেশরূপান্তর। সংস্কৃতিমন্ত্রীও ঘোষণা করেছেন, কুষ্টিয়া একদিন লালন নগরী হবে, খবর দিয়েছে কুষ্টিয়া জিলাইভ।
প্রশ্ন ও উত্তর
লালন ফকির কবে জন্মেছিলেন?
লালন সাঁই ১৭৭৪ সালে জন্মেছিলেন, পলাশীর যুদ্ধের ১৭ বছর পর, এবং ১৮৯০ সালে মারা যান।
লালনের দর্শনের মূল কথা কী?
জাত-ধর্মের বিভেদ ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভজনা করা। তাঁর ভাষায়, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
লালনের সঙ্গে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক কী?
লালনের মানবমুক্তির দর্শন ও বিভেদবিরোধী চেতনা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একই সুতায় বাঁধা, কারণ দুটিই মানুষের মর্যাদা আর আপন সংস্কৃতির মুক্তির লড়াই।
লালনের আখড়া কোথায়?
কুষ্টিয়া জেলার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া ও সমাধি অবস্থিত, যেখানে প্রতি বছর লালন স্মরণোৎসব হয়।
