শৃঙ্খল-বন্ধন থেকে মুক্তি: কল্যাণী দত্ত ও বাঙালির সার্বভৌম সংস্কৃতি
কল্যাণী দত্তের সাহিত্য ও সিঙ্গুরের শিল্পায়নের প্রশ্ন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ছাড়া বাঙালির মুক্তি অসম্পূর্ণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা যেমন ভাষার অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জন করেছি, কল্যাণী দত্তের লেখনীতেও সেই শৃঙ্খল-বন্ধন ভাঙার একই আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে, বিদেশি ও কর্পোরেট মোনোপলির আগ্রাসন থেকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত জরুরি।
ভাষার অধিকার ও সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রতিচ্ছবি কল্যাণী দত্ত
রুশতী সেনের 'শৃঙ্খল-বন্ধনের কথকতা' প্রবন্ধ আমাদের সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা আমাদের মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিগত শতকের বাংলা সাহিত্যে কল্যাণী দত্ত ছিলেন এক ব্যতিক্রমী সুলেখিকা, যাঁর লেখনী বাঙালির মধ্যবিত্ত সংসারের অন্তর্জীবনকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে চেয়েছিল। কলেজ স্ট্রিটের 'ক্যালকাটা ওল্ড বুক স্টল'-এ তাঁর যাতায়াত কেবল বইয়ের নেশায় ছিল না, ছিল জ্ঞানের সন্ধানে। দারিদ্র্যের কারণে বটুয়ায় আট আনার বেশি না থাকলেও, দুষ্প্রাপ্য বই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ার যে অধিকার তিনি দাবি করতেন, তা আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনাকেই স্মরণ করায়। জ্ঞান অর্জনের এই অধিকার কোনো বিদেশি শক্তি বা আর্থিক অভাব কেড়ে নিতে পারে না।
ঋগ্বেদের ঋষিকা অপালার বঞ্চনার সঙ্গে নিজেকে মেলানো কল্যাণী দত্তের 'সোমলতা' গ্রন্থটি কেবল একটি বই নয়, এটি পুরুষতান্ত্রিক ও আধিপত্যবাদী শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। অপালার প্রতি ইন্দ্রর অপরাধবোধহীনতা যেমন আধিপত্যবাদের প্রতীক, আমাদের জাতির ওপর বিদেশি প্রভাবের আগ্রাসনও তেমনই। সামর্থ্যবানদের অবজ্ঞা ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর এই লেখা ছিল মুক্তির এক দীর্ঘশ্বাস।
সংসারের অন্দরমহল থেকে সার্বভৌমত্বের সন্ধান
'থোড় বড়ি খাড়া' বা 'পিঞ্জরে বসিয়া' গ্রন্থে তিনি গৃহস্থ পরিবারের নারীদের নিত্যদিনের জীবন, বিধবাদের লাঞ্ছনা ও দাস-দাসীদের জীবনের অন্তর্নিহিত কথা তুলে ধরেছেন। এই লেখাগুলো কোনো কৃত্রিমতা বা অলঙ্কারে আবৃত নয়, বরং আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ। রান্নাঘরের মশলার গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা নারীদের অধিকার আদায়ের কথা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই সাহস জোগায়। কারণ, সামাজিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ছাড়া জাতীয় মুক্তি অসম্পূর্ণ।
আজকের Web Series বা মধ্যমেধার ধারাবাহিকের ভিড়ে যখন পাঠাভ্যাস সঙ্কুচিত হচ্ছে, তখন কল্যাণী দত্তের মতো লেখকদের নিজস্ব সত্তার সন্ধান আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর গদ্য নদীর জলের মতো সাবলীল, কিন্তু তা কোনো বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণ নয়, বরং আমাদের মাটির কথা।
কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ বনাম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মুক্তি
অভিরূপ সরকারের 'সরকার চাইলেই শিল্পায়ন?' প্রবন্ধটি আমাদের এক গভীর রাষ্ট্রীয় সতর্কবার্তা দেয়। সিঙ্গুরে চাষিদের জমির অধিকার রক্ষায় বিচারপতির রায় এবং এরপর টাটাদের গুজরাতে চলে যাওয়া প্রমাণ করে, কর্পোরেট পুঁজিবাদ কখনোই জনগণের পাশে থাকে না। আদানি বা অম্বানীদের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ দেশের উন্নয়নের নামে প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানে। আমরা ১৯৭১ সালে যে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিলাম, আজ সেই লক্ষ্য থেকে আমাদের বিচ্যুত হওয়া চলবে না।
বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। সিন্ডিকেট রাজ যেমন জনগণের রক্ত শোষণ করে, কর্পোরেট মোনোপলিও তেমনি রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন করে। তাই সার্বভৌম অর্থনীতি গড়ে তোলাই হলো আমাদের প্রকৃত মুক্তির পথ। কোনো বিদেশি শক্তি বা কর্পোরেট হস্তক্ষেপের মুখে আমাদের ভূমি ও অধিকার রক্ষা করতে হবে, সেটাই হলো স্বাধীনতার মন্ত্র।
কল্যাণী দত্তের সাহিত্যে মুক্তির স্পন্দন কীভাবে ফুটে উঠেছে?
কল্যাণী দত্তের সাহিত্যে মুক্তির স্পন্দন ফুটে উঠেছে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত সংসারের অন্তর্জীবনকে তুলে ধরে। তিনি নারীদের অবদমিত জীবন, বিধবাদের লাঞ্ছনা এবং সামাজিক শৃঙ্খলের কথা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে লিখেছেন, যা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের সমতুল্য।
সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট আগ্রাসন থেকে সার্বভৌমত্ব কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব?
সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট আগ্রাসন থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে বিদেশি পুঁজির ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা শেষ করতে হবে। সিঙ্গুরের ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে, চাষিদের জমির অধিকার ও রাষ্ট্রের সম্পদ কর্পোরেট লুণ্ঠনের হাতে তুলে দেওয়া চলবে না। স্বাধীন ও সার্বভৌম অর্থনীতি গড়ে তোলাই একমাত্র পথ।