মার্কিন নৌবাহিনীর গর্বের রণতরীতে বিদ্রোহের আগুন, ২৫০ দিন সমুদ্রে আটকে থাকা সেনারা চাইছেন মুক্তি
মাঝসমুদ্রে টানা ২৫০ দিন। এরপরও বন্দরে ফেরার অনুমতি না মেলায় মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সেনাদের মনে দানা বেঁধেছে ক্ষোভ ও হতাশা। যুদ্ধের মাঝেই জাহাজ ছেড়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন কয়েকজন নৌসৈনিক। ক্যাপ্টেনের তৎপরতায় ঘটনা আটকালেও প্রশ্ন উঠেছে সেনাদের মনোবল ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধে সৈনিকরা নিছক পণ্য, তাদের প্রাণের মূল্য নেই।
২৫০ দিন ধরে সমুদ্রে আটকে থাকা মার্কিন সেনাদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ?
মার্কিন নৌসেনার গর্বের প্রতীক ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই বিমানবাহী রণতরী নিয়ে বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে 'নেভি টাইমস' এবং 'স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপ্স'। তাদের দাবি, ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে সমুদ্রে মোতায়েন থাকায় যুদ্ধজাহাজটির সৈনিকদের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে বাড়ি ফিরতে চাইছেন তারা।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে বন্দরে ফেরার অনুমতি দিচ্ছে না মার্কিন প্রশাসন। ফলে রণতরী ছাড়তে মরিয়া হয়ে ওঠেন সৈনিকদের একাংশ। তাঁদেরই কয়েকজন সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন ক্যাপ্টেন।
পেন্টাগনের সিদ্ধান্তে কীভাবে বদলে গেল যুদ্ধজাহাজের পথ?
সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান' এবং 'আল জাজিরা'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ২১ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়াগো নৌসেনা ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। রণতরীটির লোহিত সাগরের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানে নামায় রাতারাতি বদলে যায় যুদ্ধজাহাজটির যাত্রাপথ।
ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরতে ইউএসএস লিংকনকে ওমান সাগরের দিকে পাঠায় পেন্টাগন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে মাত্র দুই দিনের বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছেন নৌসৈনিকরা। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথমবার গুয়ামে থামে জাহাজটি। দ্বিতীয়বার এ বছরের জুলাইয়ে ওমানের বন্দরে ২৪ ঘণ্টার জন্য ভিড়তে দেখা যায়।
সেনা পরিবারের ক্ষোভ ও প্রশ্ন: কবে ফিরবেন তাঁরা?
এ বছরের মে মাসে ইউএসএস লিংকনের ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই মেয়াদ বৃদ্ধি করে পেন্টাগন। 'স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপ্স' জানিয়েছে, অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত মার্কিন নৌসচিব হাং কাওয়ের সঙ্গে দেখা করেন সেখানে মোতায়েন অন্তত ২০০ জন সৈনিকের পরিবার। সেখানেই রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁরা।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর দাবি, সান ডিয়াগোর টাউন হলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মার্কিন নৌসেনা। সেখানেই হাং কাওকে ঘিরে ধরেন সৈনিকদের আত্মীয়েরা। যুক্তরাষ্ট্রের পদস্থ কর্তারা তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তোলেন পরিবারের সদস্যদের একাংশ।
রণতরীতে সৈনিকদের জীবনযাত্রা কতটা অসহনীয়?
ডেমোক্র্যাটিক দলের নেতা তথা মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন জানিয়েছেন, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সৈনিকদের ছত্রাকযুক্ত শাওয়ারে স্নান করতে হচ্ছে। শৌচাগারের একাংশ ভেঙে পড়েছে। মাসের পর মাস নোংরা কাপড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন সেনা অফিসার ও নাবিকেরা। যুদ্ধজাহাজটিতে নেই কোনো গরম জলের ব্যবস্থা। খাবার বলতে আধ কাপ ভাত পাচ্ছেন তাঁরা। সাবান, সুগন্ধি বা টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও ফুরিয়ে গিয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় বিমানবাহী রণতরীতে মোতায়েন থাকা অত্যন্ত কঠিন। এতে নৌসৈনিকদের স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব পড়ে। উত্তাল সমুদ্রে ঘুম ঠিকমতো না হওয়ায় শরীর ভেঙে যায়। কেউ কেউ আক্রান্ত হন 'মাল ডি ডেবার্কমেন্ট সিনড্রোম' নামের জটিল রোগে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা
সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলিকে 'ভুয়ো খবর' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। তিনি দাবি করেছেন, প্রতিটি যুদ্ধজাহাজের সৈনিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, রসদ, পানীয় জল, হাতিয়ার ও গোলা-বারুদের সরবরাহ ঠিক রাখার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীও অভিন্ন বিবৃতি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলেছে।
বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ''বিমানবাহী রণতরী লিংকন মোটেই দীর্ঘ দিন মাঝসমুদ্রে মোতায়েন নেই। সেখানকার নৌসৈনিকদের পরিবারের কেউই চিন্তিত নন। যুদ্ধজাহাজটিকে খুব শীঘ্রই স্থানান্তরিত করা হবে।''
১৯৭১-এর চেতনা থেকে শিক্ষা: সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধে সৈনিকরা পণ্য
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। তখন আমরা লড়েছিলাম নিজের ভূমি, নিজের ভাষা ও নিজের সংস্কৃতির জন্য। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা লড়েছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্নে, দেশমাতৃকার টানে। কিন্তু আজকের মার্কিন সৈনিকদের অবস্থা ভিন্ন। তারা লড়ছে অন্য দেশের স্বার্থে, সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের প্রাণের মূল্য নেই বলেই ২৫০ দিন সমুদ্রে আটকে রেখে তাদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য আমরা সবসময় সচেতন থাকব। কোনো পরাশক্তির চক্রান্তে যেন আমাদের দেশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে না পড়ে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ১৯৭১-এর চেতনাই আমাদের পথ দেখাক।
ইউএসএস লিংকন নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে কতজন সৈনিক মোতায়েন?
১৯৮৯ সালে মার্কিন নৌসেনায় কর্মজীবন শুরু করে পরমাণু শক্তিচালিত ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে মোতায়েন রয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি নৌসৈনিক।
কেন ইউএসএস লিংকনকে বন্দরে ফেরার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না?
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রশাসন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে বন্দরে ফেরার অনুমতি দিচ্ছে না। ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরতে রণতরীটিকে ওমান সাগরের দিকে পাঠানো হয়েছে।
সৈনিকদের পরিবার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
সৈনিকদের পরিবারের সদস্যরা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে সৈনিকদের ঘরে ফেরানোর দরবার শুরু করেছেন। তারা নাবিকদের মনোবল তলানিতে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন।