বিয়ের আনন্দে শোকের ছায়া: পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফের শোকাহত রংপুর
বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ জনপদে বিয়ের আনন্দের মধ্যেই নেমে এলো মৃত্যুর করাল ছায়া। রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামে এক বিয়েবাড়িতে পুকুরে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে দুই শিশু। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর যে স্বাধীন ভূখণ্ডে আমরা বাঁচতে শিখেছি, সেখানে আজও প্রতিটি আনন্দের মুহূর্তে ব্যথার বিষাদ ছায়া ফেলে যায়। আজ বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
কীভাবে ঘটলো এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা?
স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সোমবার দিবাগত রাতে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামের রতন চন্দ্র রায় তারাগঞ্জের কাংলাচড়া গ্রামে বিয়ে করেছেন। বিয়েতে যোগ দিতে রতনের বোন ওমালা রানী তাঁর ১০ বছরের মেয়ে রুপাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন। অন্যদিকে আট বছরের মেয়ে পঞ্চমীকে নিয়ে তারাগঞ্জের কাচনা গ্রাম থেকে আসেন রতনের বড় ভাই অজয়ের শ্যালিকা মিনতি রানী রায়।
নতুন বউকে ঘিরে চলছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস। আজ ফিরানির অনুষ্ঠানের (বরের বাড়িতে অনুষ্ঠান) জন্য স্বজনেরা রতনদের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। এরই মধ্যে বেলা দেড়টার দিকে গোসল করতে পুকুরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় রুপা ও পঞ্চমী।
দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের মাতম
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, বেলা দেড়টার দিকে আরাজি গ্রামের সুধীর রায়ের পুকুরে যায় রুপা ও পঞ্চমী। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের দেখা না পেয়ে স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে স্থানীয় লোকজন পুকুরে নেমে খোঁজ শুরু করেন। বেলা তিনটার দিকে পানির নিচ থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে বলে জানালেন স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল হোসেন। তিনি বলেন, 'নতুন বউকে ঘিরে যে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় ছিল, সেই উঠানেই এখন শোকাহত মানুষ। খুব হৃদয়বিদারক ঘটনা। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।'
মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস
আজ বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, আরাজি গ্রামের ওই পুকুরপাড়ে মানুষের ভিড়। পুকুর থেকে উদ্ধার হওয়া রুপা ও পঞ্চমীর মরদেহ বাড়ির উঠানে পাশাপাশি পড়ে আছে। আহাজারি করছেন স্বজনেরা। মেয়েকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শিশু দুটির মায়েরা।
রুপার নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে বিলাপ করতে করতে মা ওমালা রানী বলছিলেন, 'মামার বিয়েতে কত আনন্দ করবে এ জন্য আমার কলিজা আমার সাথে আসছিলো। আনন্দে খুশিও ছিল। মেয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছে না, মা ডাকছে না। মেয়েটা আমার সামনে পড়ে আছে। মেয়েকে বিয়ের আনন্দ দেখাতে এনেছিলাম, এখন মেয়ের লাশ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরব? কাকে নিয়ে বাঁচবো ভগবান।'
পঞ্চমীর মা মিনতি রানী বিলাপ করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফিরলে মেয়ের দিকে ছুটে যেতে ধরেন। স্বজনের আটকে রাখেন। তখন মিনতি রানী বিলাপ করছিলেন, 'বিয়ার খুশি মোর কপালো দুঃখ আনিল। মুই এখন মাওক (মেয়ে) কোনঠে পাইম। ওর বাপোক কী জবাব দেইম। মোর মাও কথা কওছে না কেন। তোরা মোর মাওক আনি দেন।'
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: দুর্ঘটনা রোধে আমাদের করণীয়
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই স্বাধীনতার মূল্যবোধ আমাদের শেখায় প্রতিটি প্রাণের মূল্য। এই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি নিরাপদ সোনার বাংলা। আজও আমাদের গ্রামীণ জনপদে পুকুর, খাল-বিলে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা থেমে নেই। এই দুর্ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার সুফল তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা আমাদের শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারব।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব নিতে হবে পুকুরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার। পাশাপাশি পরিবারগুলোকেও সচেতন হতে হবে। বাংলার মাটিতে প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে, সেটাই হোক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি প্রকৃত সম্মান।
ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা
ঘটনাস্থলে খবর পেয়ে পুলিশ এসেছে। স্থানীয় লোকজনই পুকুর থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করেছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে। এই শোকের মুহূর্তে আমরা দুই শিশুর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং তাদের ধৈর্য ধারণ করার শক্তি কামনা করি।