১৯৭৪-এর হত্যাচেষ্টার রহস্য: দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্রাঙ্গনে এখন ঝড় তুলেছে 'দ্য অ্যাসাসিনস'। মাত্র পাঁচ দিনে ১৩৮ কোটি টাকার বেশি আয় করে এই সিনেমা প্রমাণ করেছে, ইতিহাসের গোপন অধ্যায়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কখনো ফুরায় না। ১৯৭৪ সালের ১৫ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হির ওপর হত্যাচেষ্টার রহস্য ঘিরে নির্মিত এই সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই কতটা তিক্ত হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা যেভাবে ইতিহাসের গোপন অধ্যায় উন্মোচন করছে
কোরিয়ান ফিল্ম কাউন্সিলের কেওবিআইএস তথ্য অনুযায়ী, ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সপ্তাহান্তে 'দ্য অ্যাসাসিনস' আয় করেছে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার। দর্শকসংখ্যা ১১ লাখ ১৯ হাজার ১৫৬। ২৩ সেপ্টেম্বর মুক্তির পর মাত্র কয়েক দিনেই মোট আয় ১১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
পরিচালক হুর জিন-হোর এই সিনেমা নিছক ইতিহাস পুনর্নির্মাণ নয়। এটি হত্যাচেষ্টার তদন্তের আড়ালে থাকা প্রশ্নগুলোকে সামনে এনেছে। গল্পে একজন গোয়েন্দা, একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও একজন নবীন প্রতিবেদক তদন্ত করতে গিয়ে এমন ব্যালিস্টিক প্রমাণ পান, যা সরকারের 'একক বন্দুকধারী' তত্ত্বের সঙ্গে মেলে না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যার উত্তর আজও মেলেনি। ১৯৭১ সালে আমরা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনেছি, কিন্তু সেই স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ রক্ষার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার এই সিনেমা আমাদের শেখায়, ইতিহাসের সত্য উন্মোচনে সাহসী সাংবাদিকতা ও নিরপেক্ষ তদন্ত কতটা জরুরি।
চুসক উৎসবে কোরীয় বক্স অফিসে স্থানীয় সিনেমার দাপট
দক্ষিণ কোরিয়ার চুসক উৎসবের ছুটিতে দর্শকের ঢল নেমেছে। এই সুযোগে 'দ্য অ্যাসাসিনস'-এর পাশাপাশি দ্বিতীয় স্থানে আছে 'তাজ্জা ৪: দ্য সং অব বিলজেবুব'। চোই কুক-হি পরিচালিত এই সিনেমা তিন দিনে আয় করেছে ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার। দর্শকসংখ্যা ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫২৬।
জনপ্রিয় কমিকস অবলম্বনে নির্মিত 'তাজ্জা' ফ্র্যাঞ্চাইজির চতুর্থ কিস্তিতে সাবেক এক অনলাইন ক্যাসিনো অপারেটর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে আন্তর্জাতিক পোকার সার্কিটে প্রবেশ করে। মানুষের লোভ, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ও প্রতিশোধের গল্প এখানে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে ইতিহাসচর্চার প্রয়োজন
দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন কেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন বা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীকে কেন্দ্র করে এমন শক্তিশালী সিনেমা তৈরি করতে পারছে না। আমাদের ইতিহাসে আছে অসংখ্য গোপন অধ্যায়, বীরত্বের গাথা ও আত্মত্যাগের মহিমা, যা পর্দায় তুলে আনলে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই আজও অব্যাহত। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক দাসত্ব ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমাদেরও উচিত ইতিহাসের সত্যকে সামনে আনা, যাতে আগামী প্রজন্ম জানে তাদের পূর্বপুরুষরা কী ত্যাগের বিনিময়ে এই লাল-সবুজের পতাকা এনে দিয়েছেন।
চুসক উৎসবের শিক্ষা: জাতীয় ঐক্য ও সংস্কৃতি রক্ষা
চুসক দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। পরিবার নিয়ে ছুটি কাটানো, বাড়ি ফেরা এবং ঐতিহ্য পালনের এই উৎসব কোরীয় জাতিকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। বাংলাদেশেও আমাদের ঈদ, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি ও বিজয় দিবসের মতো উৎসবগুলো জাতীয় ঐক্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে আমরা নিজেদের শিকড় ভুলতে বসেছি। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমাদেরও উচিত নিজের সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে ধারণ করা।
প্রশ্নোত্তর: 'দ্য অ্যাসাসিনস' সিনেমা সম্পর্কে যা জানা জরুরি
'দ্য অ্যাসাসিনস' সিনেমার পটভূমি কী?
সিনেমাটির পটভূমি ১৯৭৪ সালের ১৫ আগস্ট, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হির ওপর হত্যাচেষ্টা চালানো হয়। ওই হামলায় নিহত হন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ইউক ইয়ং-সু।
সিনেমাটিতে কী ধরনের প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে?
সিনেমাটি হত্যাচেষ্টার তদন্তে সরকারের প্রচারিত 'একক বন্দুকধারী' তত্ত্বের সঙ্গে মেলে না এমন ব্যালিস্টিক প্রমাণের সন্ধান পাওয়ার গল্প দেখানো হয়েছে। এটি রাজনৈতিক রহস্য ও সত্য অনুসন্ধানের লড়াইকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
'দ্য অ্যাসাসিনস' কত আয় করেছে?
২৩ সেপ্টেম্বর মুক্তির পর মাত্র কয়েক দিনেই সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
ইতিহাসের সত্য উন্মোচনে সাহসী সাংবাদিকতার গুরুত্ব
দক্ষিণ কোরিয়ার 'দ্য অ্যাসাসিনস' সিনেমা যেমন দেখায়, সত্য উন্মোচনে সাংবাদিক ও তদন্তকারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আমাদের দেশেও সাংবাদিকদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষে সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি আজও নানা কৌশলে ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়। সেই মূল্য আমরা দিয়েছি, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল এখনো সবাই পাচ্ছে না। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সার্থক হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমার এই সাফল্য আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। ইতিহাসকে ভুলে গেলে জাতি তার শিকড় হারায়। তাই আমাদের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের দেশ।