স্বাধীন বাংলাদেশের সড়কে শৃঙ্খলা: অটোরিকশা নিষিদ্ধ নয়, দরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ন্যায়সংগত নীতি
১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে আজ সড়ক পরিবহন এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দেশের গ্রাম-শহরের লাখো মানুষের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হয়ে উঠলেও, এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার ও নিরাপদ জীবনের অধিকার। তাই অটোরিকশা বন্ধ করার পরিবর্তে প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত, মানবিক ও ন্যায়সংগত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, যা আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেবে।
অটোরিকশা কেন বাংলাদেশের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ?
বাংলাদেশের অনেক শহর ও উপজেলায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন নেই। গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা কিংবা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে মানুষকে প্রায়ই ব্যক্তিগত যানবাহন বা ব্যয়বহুল পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে অটোরিকশা অপেক্ষাকৃত কম খরচে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সরু বা দুর্বল সড়কে, যেখানে বড় যানবাহন চলাচল করতে পারে না, সেখানে এর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট।
অটোরিকশা শুধু যাতায়াতের সুবিধাই তৈরি করেনি; এটি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ, মেরামত, চার্জিং, বিক্রয়, গ্যারেজ, চালক ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতির একটি অংশ সক্রিয় হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এটি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
সড়কে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার কেন উদ্বেগের কারণ?
কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠটি আরও গভীরভাবে দেখা দরকার। সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, যানবাহনের মান এবং ট্রাফিক আইন মানার বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে একই সড়কে এমন যানবাহন চলছে, যার চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা ট্রাফিক-জ্ঞান আছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এটি শুধু অটোরিকশাচালকের জন্য ঝুঁকি নয়; পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী, বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। একজন অভিজ্ঞ গাড়িচালককে জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে সমস্যাটি কতটা বাস্তব। অনেক অটোরিকশা যেখানে থামানো উচিত নয়, সেখানে থামে। যেখানে ইউটার্ন নেওয়া নিরাপদ নয়, সেখানে ইউটার্ন নেয়। কখনো হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয়। অনেক সময় ট্রাফিক সিগন্যাল বা লেন ব্যবস্থাপনাও যথাযথভাবে মানা হয় না। এসব আচরণ অন্য যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
যানবাহনের নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি কীভাবে দুর্ঘটনা বাড়ায়?
আরও বড় সমস্যা হলো যানবাহনের দৃশ্যমানতা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম। অনেক অটোরিকশায় পর্যাপ্ত রিয়ার-ভিউ মিরর, ব্রেক লাইট, টার্ন ইন্ডিকেটর বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় আলোকসংকেত থাকে না। ফলে পেছন থেকে আসা চালকের পক্ষে অটোরিকশাটি কখন কোন দিকে ঘুরবে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতের বেলায় এই সমস্যা আরও বিপজ্জনক হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় নীতির অসামঞ্জস্য: কেন একই সড়কে ভিন্ন নিয়ম?
এখানে রাষ্ট্রের নীতির একটি অসামঞ্জস্যও চোখে পড়ে। একটি মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়। গাড়ির নিবন্ধন, কর, ফিটনেসসহ বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। একই সড়ক ব্যবহারকারী অন্যান্য যানবাহনের মালিক ও চালকদের জন্য নানা ধরনের আইন ও বিধিবিধান প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
ফলে দুটি সমস্যা একসঙ্গে তৈরি হচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে বা আংশিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলছে; অন্যদিকে যাঁরা নিয়ম মেনে যানবাহন পরিচালনা করছেন, তাঁদের সঙ্গে একটি অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এটি কেবল পরিবহন নীতির সমস্যা নয়, এটি ন্যায়সংগত নিয়ন্ত্রণেরও প্রশ্ন।
অটোরিকশার মালিকানা কাঠামো: কার স্বার্থে চলছে এই যান?
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে, অটোরিকশার মালিকানা কাঠামো। এটি অনেকের একক জীবিকার বাহন হলেও কোথাও কোথাও অটোরিকশা বড় আকারের ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত হয়েছে। একেকজন মালিকের কাছে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা থাকার কথাও শোনা যায়। মৌসুমি সময়ে গ্রামের কৃষিশ্রমিক বা অন্য পেশার মানুষ কাজের সন্ধানে শহরে এসে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। তাঁদের অনেকেরই হয়তো আগে কখনো পেশাদারভাবে যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই।
এখানে প্রশ্নটি খুবই সরল: একজন মানুষকে প্রশিক্ষণ না দিয়ে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এবং কার্যকর তদারকি ছাড়া জনসাধারণের ব্যবহৃত সড়কে একটি যান্ত্রিক যান চালানোর সুযোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক?
অটোরিকশা নিষিদ্ধ না করে কী করা যেতে পারে?
উত্তরটি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা নয়। কারণ, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বাস্তবতার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামো।
প্রথমত: সহজ ও স্বচ্ছ নিবন্ধনব্যবস্থা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি যানবাহনের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় নম্বর থাকবে। মালিক কে, চালক কে, কোন এলাকায় যানটি চলবে, এসব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত: বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ
চালকদের জন্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। প্রশিক্ষণে ট্রাফিক আইন, সড়কচিহ্ন, ইউটার্ন, ওভারটেকিং, যাত্রী ওঠানো-নামানো, পথচারীর নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় শেখানো যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষ করে একটি মৌলিক দক্ষতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই চালানোর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত: ন্যূনতম নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক
প্রতিটি অটোরিকশায় ন্যূনতম নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা দরকার। রিয়ার-ভিউ মিরর, ব্রেক লাইট, টার্ন ইন্ডিকেটর, প্রতিফলক ও কার্যকর ব্রেকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন নয়। এগুলোকে যানবাহনের অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
চতুর্থত: স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে রুট ও সময় নির্ধারণ
সব জায়গায় একই নিয়ম প্রয়োগ না করে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে রুট ও সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোনো সরু গ্রামীণ সড়কে যে যানবাহন কার্যকর, সেটি হয়তো একটি ব্যস্ত নগর সড়কে যানজটের বড় কারণ। তাই কোথায়, কখন এবং কীভাবে অটোরিকশা চলবে, এ বিষয়ে স্থানীয় পরিবহন পরিকল্পনা থাকা দরকার।
আইন প্রয়োগে বৈষম্য দূর করা: সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। অটোরিকশাচালক নিম্ন আয়ের মানুষ, এই কারণে তাঁদের জন্য আইন আলাদা হতে পারে না। আবার তাঁদের জীবিকার বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। তাই প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আইন হবে সবার জন্য সমান, কিন্তু বাস্তবায়ন হবে মানবিক ও পর্যায়ক্রমিক।
অটোরিকশা বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রয়োজন থেকে জন্ম নিয়েছে। এটি নিম্ন আয়ের মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখেছে। তাই একে কেবল যানজট বা দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখাও ভুল হবে। একইভাবে এর সামাজিক প্রয়োজনীয়তার কথা বলে অনিয়ম, অদক্ষতা ও নিরাপত্তাহীনতাকে বৈধতা দেওয়াও সমান ভুল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সড়ক নিরাপত্তা: আমাদের কর্তব্য
রাষ্ট্রের কাজ কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং যাত্রী, চালক, পথচারী, অন্যান্য যানবাহনের চালক এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের মধ্যে একটি ন্যায়সংগত ভারসাম্য তৈরি করা। অটোরিকশাকে উচ্ছেদ নয়, শৃঙ্খলার মধ্যে আনাই হতে পারে সেই ভারসাম্যের পথ।
গরিবের যাতায়াতের বাহন হিসেবে অটোরিকশার প্রয়োজন আছে। কিন্তু গরিবের বাহন বলেই এর চালক বা মালিককে সড়কনিরাপত্তার নিয়মের বাইরে রাখার কোনো যুক্তি নেই। একই সড়ক সবার। তাই দায়িত্বও সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে এখন অটোরিকশা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। নিষেধাজ্ঞার বদলে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, রুট ব্যবস্থাপনা, মালিকানা নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ, এই ছয়টি বিষয়কে সামনে রেখে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করা দরকার। তা না হলে একদিকে অটোরিকশা মানুষের প্রয়োজন মেটাবে, অন্যদিকে সেই প্রয়োজনই ধীরে ধীরে সড়কের বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে উঠবে।
মানুষের চলাচলের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদে চলাচলের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। অটোরিকশা সেই দুই অধিকারের সংঘাতের প্রতীক না হয়ে সমাধানের অংশ হবে, এটাই এখন আমাদের নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে আমরা যে বাংলাদেশ গড়তে চাই, সেই বাংলাদেশে সড়ক হবে নিরাপদ, ন্যায়সংগত এবং সবার জন্য সমান।