শিক্ষাক্রমে সংস্কৃতি ও স্বাবলম্বন: মুক্তির চেতনায় নতুন প্রজন্ম
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণা ছিল আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। শত্রুর বুলেট আমাদের শরীরে আঘাত করেছিল, কিন্তু বাঙালির সংস্কৃতির মূলে তা কখনো ধস নামাতে পারেনি। আজ, সেই চেতনায় উদ্বেলিত হয়েই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। ২০২৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রমে আরও চারটি বিষয় যুক্ত হবে, যা আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও আত্মনির্ভরশীলতাকে শেকড়ে টিপিয়ে ধরবে।
নতুন এই বিষয়গুলো হলো আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শ্রেণি থেকেই ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তাদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং আনন্দময় শিক্ষা বা 'Learning with Happiness' পড়তে হবে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষার গুরুত্বও দেওয়া হবে। সোমবার সচিবালয়ে এসব তথ্য জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তার সাথে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
সংস্কৃতি ও ক্রীড়া: বাঙালির অস্তিত্বের চেতনাবোদ্ধকরণ
একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকচক্র আমাদের সংস্কৃতিকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আজ সেই সংস্কৃতির মুক্তির ডাক শিক্ষাক্রমে উঠে এসেছে। বর্তমানে স্কুলগুলোতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা থাকলেও, তা শিক্ষাক্রমের মূল অংশ ছিল না। ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সবসময় শিক্ষাক্রমে থাকা উচিত। সেজন্যই সরকার দ্রুত এই বিষয় দুটোকে যুক্ত করছে।
যেমন, আমরা প্রাথমিকে আটটি খেলা যুক্ত করতে চাই। কিন্তু একবারে এটি সম্ভব না। তাই, আমরা চেষ্টা করবো অন্তত দুই-তিনটি খেলাকে যোগ করতে।
আপাতত ফুটবল ও দাবাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, ক্রিকেটও যুক্ত করা যেতে পারে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গান, আবৃত্তি, বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতা থাকবে। সংস্কৃতি বিষয়টিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক. Performative। দুই. Expressive। গান, নাচ, বক্তৃতা, পেইন্টিং বা সাহিত্য থেকে শিক্ষার্থীরা বেছে নিতে পারবে। Performative-এ শিল্প সরাসরি পরিবেশন করতে হবে, আর Expressive-এ নিজের ভাবনা সৃজনশীলভাবে প্রকাশের বিষয়টি বেশি জরুরি। মূলত, এটি আমাদের মুক্তির চেতনায় উদ্বেলিত সাংস্কৃতিক মুক্তির পথ।
কারিগরি শিক্ষা: আত্মনির্ভরশীল ও সার্বভৌম বাংলাদেশ
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আত্মনির্ভরশীল হতে হয়। বিদেশি ঋণ ও এনজিওর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে আমাদের নিজস্ব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মাহ্দী আমিন বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে সমাজের চোখে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। এই ধারণা ভেঙে এটিকে মূলধারার শিক্ষায় আনতে চাই। সব স্কুলে একটি করে কারিগরি ল্যাব থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়া একমাত্র পথ নয়। স্কুল পর্যায় থেকেই কারিগরি দক্ষতা অর্জন করলে শিক্ষার্থীরা স্বাবলম্বী হতে পারবে। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাখবে।
আনন্দময় শিক্ষা বা Learning with Happiness
শিক্ষা কখনোই ভয়ের বা চাপের হওয়া উচিত নয়। মুক্তির স্পৃহা থেকে জন্ম নেওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় আনন্দের স্থান প্রধান হওয়া দরকার। মাহ্দী আমিন জানান, Learning with Happiness-এর দুটি দিক আছে। এক, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার Value ও Principle। শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ক্লাস করবে। দুই, এই সাবজেক্টের মাধ্যমে তারা নীতি, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সুশিক্ষা শিখবে।
বাস্তব জীবনে মূল্যবোধের প্রয়োগ শেখানো হবে এখানে। যেমন, বৃক্ষরোপণ কেন জরুরি ও কীভাবে করতে হয়, তা তারা নিজের হাতে শিখবে। মাহ্দী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য কী, কেন মানবাধিকার গুরুত্বপূর্ণ, তার ব্যবহার আমরা দেখাব। ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের রক্তে অর্জিত আমাদের অধিকারের ইতিহাস এভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন
ববি হাজ্জাজ জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি যুক্ত হবে, যা মূলত Pilot পর্যায়ের অংশ। ২০২৮ সালে পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তন আসবে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আগেই জানিয়েছেন, স্বল্প সময়ে পুরোপুরি পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই ২০২৭ সালে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম আসবে এবং ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে। নতুন বিষয়গুলোতে কোনো GPA থাকবে না, কেবল পাস বা ফেল হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।
শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় শুরু হয়েছে। Learning with Happiness পড়ানোর জন্য বিশেষ গাইডলাইন তৈরি হবে এবং বাছাই করা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া তৃতীয় ভাষা শেখার জন্যও শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে, যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে আমাদের প্রজন্ম বিশ্বজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।