আফগানিস্তানের বুকে আবার জ্বলছে প্রতিরোধের আগুন। তালিবান শাসনের পাঁচ বছর পেরোতে না পেরোতেই উত্তর-পূর্বের দুর্গম বাদাখশান প্রদেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে নতুন এক সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ‘সেপাহিয়ান-ই মিহান’ বা ‘দেশপ্রেমিক সৈনিক ফ্রন্ট’ নামের এই গোষ্ঠীটি পাকিস্তান সীমান্তবর্তী ইয়াফতাল জেলার প্রশাসনিক কার্যালয় দখল করে নিয়ে তালিবান প্রশাসনকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনা কি আবারও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে কাবুলিওয়ালার দেশকে? নাকি এটি তালিবানের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরই বহিঃপ্রকাশ? প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে।
বাদাখশানের কৌশলগত গুরুত্ব ও বিদ্রোহের কারণ
হিন্দুকুশ পর্বত ও পামির মালভূমির সংযোগস্থলে অবস্থিত বাদাখশান প্রদেশটি শুধু ভৌগোলিকভাবেই নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকার সীমান্ত চীন, পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত। তাই এখানে নতুন করে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান তালিবানের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তালিবান শাসনের দমন-পীড়ন ও মৌলবাদী শাসনপদ্ধতির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের জেরেই সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে এই গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। এতে রয়েছেন প্রাক্তন সৈনিক ও আফগান মুজাহিদিন কমান্ডাররা। তবে অযথা রক্তপাত তাদের উদ্দেশ্য নয় বলে দাবি করছেন গোষ্ঠীটির এক সদস্য।
তালিবানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল: কাবুল বনাম কন্দহর
এই বিদ্রোহের পেছনে তালিবানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিবিসির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ‘তালিবানের শীর্ষে ফাটল’ শীর্ষক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তালিবান এখন দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। এক পক্ষে আছেন কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ও তাঁর অনুগামীরা। অপর পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হক্কানি।
আখুন্দজাদার একটি ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপে তিনি দলীয় নেতৃত্বকে বিভাজনের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘বিভাজনের জেরে আমিরশাহি ভেঙে পড়বে এবং তা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।’ এই অডিও ক্লিপের সত্যতা স্বীকার করেছে তালিবানের শীর্ষনেতৃত্ব। ফলে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের রাজনীতিতে পাকিস্তানের উস্কানি থাকতে পারে বলে দানা বেঁধেছে সন্দেহ।
সেপাহিয়ান-ই মিহানের উত্থান: প্রতিরোধের নতুন অধ্যায়
গত কয়েক বছর ধরেই তালিবান শাসনের বিরুদ্ধে পঠানভূমির বিভিন্ন এলাকায় জমছে ক্ষোভ। বাদাখশান প্রদেশে ইতিমধ্যেই সক্রিয় রয়েছে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট নামের দুটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তাদের চোরাগোপ্তা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কিছু তালিবান যোদ্ধা। এবার তৃতীয় গোষ্ঠী হিসেবে সেপাহিয়ান-ই মিহানের আবির্ভাব তালিবানের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করল।
সাবেক সেনাকর্তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে গেরিলা যুদ্ধ চালানোর সুযোগ পাবে এই তিন পক্ষ। সেক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছেই। তবে তালিবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব ঘটনার পর বাদাখশান সফর করে সেখানে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
মুক্তির বার্তার দৃষ্টিভঙ্গি: স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আফগানিস্তানের এই ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তালিবানের মৌলবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই প্রতিরোধ আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল্য। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে বিদেশি শক্তির উস্কানি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে যদি আবারও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে তা শুধু আফগানিস্তান নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে আমাদের উচিত আফগানিস্তানের জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করা। কারণ, যে জাতি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য লড়াই করতে জানে, সেই জাতিই পারে অন্য জাতির মুক্তির সংগ্রামকে বুঝতে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
সেপাহিয়ান-ই মিহান কারা?
সেপাহিয়ান-ই মিহান একটি নবগঠিত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী যার নামের অর্থ ‘দেশপ্রেমিক সৈনিক ফ্রন্ট’। তালিবান শাসনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাদাখশানের স্থানীয় জনজাতি, প্রাক্তন সৈনিক ও মুজাহিদিন কমান্ডাররা এই গোষ্ঠী গঠন করেছেন।
বাদাখশান বিদ্রোহের পেছনে পাকিস্তানের কোনো ভূমিকা আছে কি?
বিবিসির প্রতিবেদনে তালিবানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের রাজনীতিতে পাকিস্তানের উস্কানি থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ইসলামাবাদকে নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বিবৃতি দেয়নি কাবুল। বাদাখশানের পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অবস্থান এই সন্দেহকে আরও জোরালো করছে।
এই বিদ্রোহ কি আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা?
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তালিবানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নতুন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থান আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে বর্তমানে এটি একটি স্থানীয় বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।