তারেকের দিল্লি সফরের শর্তেই কি হাসিনাকে ফেরাচ্ছে ভারত? প্রত্যাবর্তনের বিতর্ক নিয়ে ফের মুখ খুললেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনি স্বদেশে ফিরবেন। ভারতের মাটিতে প্রথম সাংবাদিক বৈঠকের পর এবার হিন্দুস্তান টাইম্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি। এই সাক্ষাৎকারকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতর অব্যাহত রয়েছে।
ভারতের শর্ত কি হাসিনার প্রত্যাবর্তনের কারণ?
আসন্ন ব্রিক্স সম্মেলনে ভারতে আসার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে তিনি ভারতে যাবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ঢাকা জানিয়েছে, তারেকের ভারত সফরের শর্ত হিসেবে নয়াদিল্লির কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি রাখা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সেই কারণেই কি ডিসেম্বরের মধ্যে হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা?
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বলেন,
''আমি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাংবাদিক সম্মেলন করেছি। দু'দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটা কী ভাবে সমস্যার হতে পারে? ২০০৭ সালে তারেক রহমান যখন ব্রিটেনে যান তখন তিনি একটি স্ট্যাম্প পেপারে সই করেছিলেন। রাজনীতির না-করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু লন্ডন থেকে তিনি রাজনীতি করেছেন।''
তিনি আরও বলেন, তারেক রহমান খালেদা জিয়ার জায়গায় দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সামলেছেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জনসভা করেছেন। কিন্তু তিনি কখনও ব্রিটিশ সরকারকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেননি। হাসিনার প্রশ্ন, ''এই পরিস্থিতিতে আমার প্রত্যর্পণ কী ভাবে একটি শর্ত হতে পারে, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।''
কেন ফিরতে চান হাসিনা?
দু'বছরের বেশি সময় পর বাংলাদেশে ফেরার নেপথ্যে কারণ ব্যাখ্যা করে হাসিনা বলেন,
''বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই কারণে আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই। উন্নয়ন থমকে গেলে কর্মসংস্থানও থেমে যায়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। চরমপন্থী চক্রগুলি আবার সক্রিয় হলে সেটা বাংলাদেশে আঞ্চলিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।''
হুমকি বা হামলার সম্মুখীন হতে তিনি ভয় পান না জানিয়ে হাসিনা বলেন,
''আমার জীবনের উপর হুমকি নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে আমি আমার পরিবারকে হারিয়েছিলাম। সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্র বা হত্যার চেষ্টার সম্মুখীন বার বার হয়েছি। ২০০৪ সালের ২১ অগস্ট আমাকে খুনের চেষ্টায় ঢাকায় আমার এক জনসভায় গ্রেনেড ছোড়া হয়। আমি বেঁচে গেলেও আমার অনেক সহকর্মী বাঁচেননি। সেই হামলা তখন আমাকে থামাতে পারেনি, আর এখন কোনও হুমকিই আমার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারবে না।''
তিনি আরও বলেন, ''আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নই। ক্ষমতার জন্য বাংলাদেশে ফিরতে চাইছি, সেটা নয়। আমার ফেরার একমাত্র কারণ বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো।'' তবে ঠিক কবে ফিরবেন, তা এখনই জানাতে রাজি নন তিনি। তাঁর কথায়, ''তারিখ, সময় যথাসময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে।''
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে যা বললেন হাসিনা
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরেও সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। এই প্রসঙ্গে হাসিনার প্রশ্ন,
''কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হল? আওয়ামী লীগ যদি খারাপ কিছু করে থাকে, তবে বাংলাদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচনে জনগণ তার উত্তর দেবে। যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের কি আমাদের দলকে নিষিদ্ধ করার অধিকার রয়েছে?''
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দলের অনেক নেতাই দেশছাড়া হয়েছেন। আবার অনেকে বাংলাদেশে থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। হাসিনা জানান,
''আওয়ামী লীগের ছোট-বড় বহু নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ছ'লাখের বেশি মামলা হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে কি কেউ মুখ খুলবে না?''
পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, ''২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে আগুন লাগানো, হামলা, হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কেন কোনও মামলা হবে না? কেন অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়া হল?'' হাসিনার মতে, ''বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীরা বিচরণ করছে।''
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে হাসিনার আস্থা
হাসিনা মনে করেন, কোনও নিষেধাজ্ঞাই আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যতে ইতি টানতে পারবে না। তাঁর কথায়,
''আওয়ামী লীগ ছিল, আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। ওরা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে পারে বা যে কোনও ধরনে পদক্ষেপ করতে পারে, কিন্তু দলের জনসমর্থন থেকে যাবে। আমি আমার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি। দলীয় নেতাকর্মীদের উপর অত্যাচারের পরেও যদি কোনও দল জনগণের কাছে জনপ্রিয় থাকতে পারে তবে সেটা হল আওয়ামী লীগ।''
ঢাকার আপত্তি ও ভারতের অবস্থান
হাসিনার সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে প্রথম থেকেই আপত্তি তুলেছিল ঢাকা। সাংবাদিক সম্মেলনের আগেই ঢাকার তরফে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছিল, হাসিনাকে এই কর্মসূচির অনুমতি দিলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ঢাকা। ভারতের মাটিতে এ ধরনের আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করে। তবে ভারত বার বার স্পষ্ট করেছে, ওই কর্মসূচির সঙ্গে সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই। ওই মঞ্চ থেকে যা যা কথা হয়েছে তা সমর্থন করে না নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
প্রত্যাবর্তন নিয়ে বারবার ঘোষণা কেন?
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও প্রাসঙ্গিক। সেই চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে বাংলাদেশকে আবারও অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এবং তারেকের ভারত সফরের শর্ত, দু'টোই দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মোড়ের ইঙ্গিত দেয়। আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে এগোয়, সেদিকে তাকিয়ে আছে পর্যবেক্ষকরা।