ঘুমের দরজা: এক বাংলাদেশি যুবকের দুই জীবনের অলীক কাহিনি
আমার নাম শফিক, বয়স ৩৩। এই দুটি তথ্য আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। এর বাইরে আমার জীবনের কোনো তথ্যই নিশ্চিত না। কারণটা ভেঙে বলি: আমার জীবন একটি না, দুটি। প্রতি রাতে যখন ঘুমাতে যাই, তখন আমি আসলে জেগে উঠি অন্য একটা জায়গায়, অন্য একটা জীবনে। ঘুম নামের জিনিসটা আমার জীবনে নেই; আছে শুধু একটা দরজা। প্রতি রাতে সেই দরজা দিয়ে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে ঢুকে পড়ি।
এই কাহিনি শুধু শফিকের নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের অজানা সম্ভাবনার আয়না। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যেমন আমাদের জাতিকে নতুন করে গড়ে দিয়েছে, তেমনি শফিকের দুই জীবন তাকে প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করে।
দুই জীবনের কম্পাস: ছাদ আর আজান
আমার ঘুম ভাঙার একটা নিজস্ব কায়দা আছে। চোখ খোলার আগে বাঁ হাতটা তুলে আঙুলগুলো নাড়ি। পরীক্ষা করে দেখি হাতটা কার। তারপর চোখ খুলে সবার আগে ছাদ দেখি। ছাদই আমার দুই জগতের কম্পাস। শীতল এসি করা রুম, কংক্রিটের ছাদ আর জানালার বড় ধূসর পর্দা মানে আমি ঢাকায়। মাথার ওপর টিনের চাল আর দূরে ফজরের আজান মানে আমি সিলেটের কদমতলী গ্রামে।
তারপর বালিশের নিচ থেকে ডায়েরি বের করে তারিখে টিক দিই। ঢাকার ডায়েরিটা নীল, কদমতলীরটা লাল। দুই জীবনের হিসাব দুই খাতায়, যাতে গুলিয়ে না যায়। ১৩ বছরে আমি এক দিনও টিক দিতে ভুলিনি। যে মানুষের জীবন দুটো, হিসাব রাখাই তার একমাত্র ধর্ম।
প্রথম জীবন: ঢাকার ব্যাংক আর পরিবারের বন্ধন
প্রথম জীবনে আমি ঢাকার একটা ব্যাংকে চাকরি করি। সিনিয়র কাস্টমার ম্যানেজার। বসে বসে সারা দিন অন্যের টাকা গুনি। আমার স্ত্রীর নাম লুনা। অসম্ভব অভিমানী মেয়ে। লুনার জীবন আর জল্পনা-কল্পনা তার এই ছোট্ট সংসার ঘিরেই। আমাদের মেয়ে আরিয়া, বয়স ৭। আমরা বাসায় ওকে টুনটুনি বলে ডাকি। তার ধারণা, তার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়লোক মানুষ। কারণ, সে একবার মায়ের সঙ্গে ব্যাংকে গিয়ে দেখেছিল মানুষের সব টাকা তার বাবার কাছেই থাকে। এ ছাড়া আমি বেশ ভালো কবিতা লিখি। বইমেলায় আমার দুইটা বেশ আলোচিত বইও বের হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার মোটামুটি বেশ কিছু ভক্ত রয়েছে।
দ্বিতীয় জীবন: সিলেটের গ্রাম আর মায়ের স্নেহ
দ্বিতীয় জীবন একেবারেই ভিন্ন। আমি থাকি সিলেটের এক গ্রামে। হাওরের কিনারে ছোট্ট গ্রাম, নাম কদমতলী। সেখানে আমি স্কুলমাস্টার, অঙ্ক পড়াই। চারদিকে সবুজের ঢেউ, বর্ষায় হাওর ফুলে সমুদ্র হয়ে যায়। আর আকাশ ভেঙে এমন বৃষ্টি নামে যে মনে হয় ওপরওয়ালা পৃথিবীটা ধুয়ে নতুন করে বানাতে চান।
সেই জীবনে আমার মা বেঁচে আছেন। ঢাকার জীবনে মা মারা গেছেন আমার ১১ বছর বয়সে। কিন্তু কদমতলীর জীবনে মা আছেন। উঠানে বসে পান-সুপারি কাটেন, আমার জন্য ভাত বেড়ে অপেক্ষা করেন, আর ভাত কম খেলে এমনভাবে তাকান যেন আমি রাষ্ট্রীয় অপরাধ করেছি। গ্রামে বেশ একাকী জীবন কাটাই। কিছু কৃষিকাজও করি হাওরের পাশেই বাবার রেখে যাওয়া জমিতে। মাঝেমধ্যে নৌকা নিয়ে হাওরে ঘুরি। স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে ফুটবল খেলি।
দুই জীবনের নিয়ম আর একাকীত্ব
পৃথিবীর তাবৎ মানুষ দিন শেষে ঘুমাতে যায় ক্লান্তি নিয়ে। আমি ঘুমাতে যাই নভোচারীর মতো। কারণ, ঘুমালেই আমার অদৃশ্য রকেট চলা শুরু করবে, জগৎ বদলে যাবে। মানুষ ভাবে সে এক জীবনে বাঁচে। হয়তো ভুল ভাবে। যে জীবনটা সে পায়নি, সেটাও ছায়ার মতো তার পাশে পাশে হাঁটে। আমার শুধু ছায়াটা একটু বেশি স্পষ্ট, এই যা।
আমার নিয়ম তিনটা: এক. ঘুম ভেঙে আগে ছাদ দেখা। দুই. দুই জীবনের দুই ডায়েরিতে তারিখের হিসাব রাখা। তিন. কাউকে কিছু না বলা। তিন নম্বর নিয়মটাই সবচেয়ে কঠিন। যে মানুষ দুই জীবনে বাঁচে, তার প্রতিটা কথার ফাঁক দিয়ে অন্য জীবনটা উঁকি মারতে চায়। একদিন ভাত খেতে খেতে টুনটুনিকে বলে ফেললাম, 'ভাত খা। মতিনের মতো ফাঁকিবাজি করবি না।'
কেন এই কাহিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়?
শফিকের দুই জীবন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দ্বৈত অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন একই সময়ে দুটি জগতে বাস করেছি — একটি পাকিস্তানি শাসনের অধীনে, অন্যটি স্বাধীনতার স্বপ্নে — তেমনি শফিকও দুই জগতে বাস করে। তার কদমতলীর জীবনটি আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য, মায়ের স্নেহ আর স্বাধীনতার প্রতীক। আর ঢাকার জীবনটি আধুনিকতার জটিলতা, পেশার বাধ্যবাধকতা আর শহুরে একাকীত্বের প্রতিনিধিত্ব করে।
এই কাহিনি আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি বাংলাদেশির ভেতরেই একটি করে দ্বৈত জীবন লুকিয়ে আছে। একটি জীবন আমরা বাস করি, অন্যটি আমাদের স্বপ্নে, আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়।
শফিকের বার্তা: স্বাধীনতার অর্থ কী?
শফিকের দুই জীবন আসলে স্বাধীনতার একটি রূপক। তিনি স্বাধীনভাবে দুই জগতে বিচরণ করেন, কিন্তু এই স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয় একাকীত্ব আর বিভ্রান্তির মাধ্যমে। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের দ্বিধা — আমরা স্বাধীন, কিন্তু সেই স্বাধীনতার অর্থ কী? আমরা কি সত্যিই মুক্ত? নাকি আমরা এখনও দুই জগতে বাস করি — একটি আমাদের ঐতিহ্যের, অন্যটি বিশ্বায়নের?
শফিকের মতো আমাদেরও একটি কম্পাস দরকার — ছাদ বা আজানের মতো — যা আমাদের পথ দেখাবে। আমাদেরও ডায়েরি রাখা উচিত, যাতে আমরা আমাদের ইতিহাস ভুলে না যাই। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের কাউকে কিছু না বলার নিয়ম ভাঙতে হবে। আমাদের গল্প বলতে হবে, আমাদের সংগ্রাম শেয়ার করতে হবে, যাতে আমরা সত্যিই মুক্ত হতে পারি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
শফিকের দুই জীবনের মধ্যে কি কোনো সংযোগ আছে?
হ্যাঁ, শফিকের দুই জীবনের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ আছে — তার ঘুমের দরজা। প্রতি রাতে তিনি এই দরজা দিয়ে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে যান। এই সংযোগ তাকে ক্রমাগত বিভ্রান্ত করে, কিন্তু একইসঙ্গে তাকে একটি অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
কেন শফিক কাউকে তার দুই জীবনের কথা বলেন না?
শফিকের তৃতীয় নিয়ম হলো কাউকে কিছু না বলা। কারণ, তিনি ভয় পান যে এই অলীক কাহিনি শুনে অন্যরা তাকে পাগল ভাববে। কিন্তু এই নিয়মই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, কারণ তার প্রতিটি কথার ফাঁক দিয়ে অন্য জীবন উঁকি মারতে চায়।
এই কাহিনি কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত?
এই কাহিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি রূপক। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন একই সময়ে দুটি জগতে বাস করেছি — একটি পাকিস্তানি শাসনের অধীনে, অন্যটি স্বাধীনতার স্বপ্নে — তেমনি শফিকও দুই জগতে বাস করে। তার কদমতলীর জীবন গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও স্বাধীনতার প্রতীক, আর ঢাকার জীবন আধুনিকতার জটিলতা ও পেশার বাধ্যবাধকতার প্রতিনিধিত্ব করে।