গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে 'পিপলস মার্চ' অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী বিক্ষোভীরা নির্বাচন কমিশনের দিকে অগ্রসর হতে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড অতিক্রমে বাধা দেয়, এবং সন্ধ্যায় শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশি সূত্রে জানানো হয়েছে।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, কনট প্লেসের কাছে বাংলা সাহেব গুরুদ্বারের সামনে সমবেত কয়েক শত বিক্ষোভী জ্ঞানেশ কুমার ও এসআইআর-প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে অশোক রোড ধরে নির্বাচন কমিশনের মূল দপ্তরের দিকে এগিয়ে যান। পুলিশ বাধা দিলে তাঁরা পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রাস্তায় বসে পড়েন, এবং তারপরই শুরু হয় গ্রেপ্তার।
যা ঘটেছিল শুক্রবার বিকেলে
বাম ও কৃষক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। আয়োজকেরা আগাম জানিয়েছিলেন, তাঁরা দিল্লি পুলিশের অনুমতি নেবেন না; শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের দিকে হাঁটবেন, পুলিশ বাধা দিলে রাস্তায় বসে পড়বেন, কিন্তু হিংসাত্মক হবেন না। ঘটনাক্রম প্রায় সেভাবেই ঘটেছে। গোল ডাকখানার সামনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভীদের হাতে ছিল নানা ধরনের পোস্টার, মুখে ছিল 'ভোট চোর গদ্দি ছোড়' স্লোগান।
ওই তল্লাটে আধাসামরিক বাহিনী, র্যাফ, নারী পুলিশ এবং জলকামানের গাড়ি মোতায়েন রাখা হয়েছিল। তবু পুলিশকে বলপ্রয়োগ করতে হয়নি; ব্যারিকেডের সামনেই বিক্ষোভীরা থেমে যান। লাউডস্পিকারে সতর্কবার্তা দেওয়ার পর অপেক্ষমাণ বাস ও পুলিশের ভ্যানে তাঁদের তোলা হয়। দীর্ঘদিন পর দিল্লি পুলিশকে আন্দোলনকারীদের প্রতি এতটা সংযত দেখা যায়নি বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে মন্তব্য করা হয়েছে।
বড় নামগুলোর গরহাজিরি
ঘোষিত তালিকায় ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র তারকা প্রকাশ রাজ, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের স্বামী অর্থনীতিবিদ পরকলা প্রভাকর, কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত, মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী এবং ছাত্রনেতা ঐশী ঘোষ। কিন্তু কার্যত উপস্থিত ছিলেন সিপিএমের বৃন্দা কারাত, সিপিআই-এর অ্যানি রাজা, আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও অঞ্জলি ভরদ্বাজের সঙ্গে সংযুক্ত কিষান মোর্চা ও যুব-ছাত্র সমাজের সহস্রাধিক সমর্থক। অভিজিৎ দিপকে ও আইসা নেত্রী নেহা বোরার মতো ঘোষিত ব্যক্তিত্বরাও আসেননি।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডেকে একই সময়ে মন্দির মার্গ থানায় যেতে দেখা যায়। তিহার জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ক্রাইম ব্রাঞ্চে হাজিরার নির্দেশ পাওয়ায় তাঁরা সেখানে উপস্থিত হচ্ছিলেন। ইটিভি ভারতের সংবাদ অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বেশ কয়েকদিন ধরে এই আন্দোলন চলছে, এবং এরই মধ্যে আইসা নেত্রী নেহা বোরা তেরঙা যাত্রায় যোগ দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন।
এসআইআর বিতর্ক ও জ্ঞানেশ কুমার: কেন এই আন্দোলন
ভোটার তালিকায় সম্ভাব্ত অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া, অর্থাৎ এসআইআর, নিয়ে ভারতের বিরোধী শিবিরের ভয় গভীর। তাঁদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বাংলাভাষী, দলিত ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে শুরু থেকেই। এশিয়ানেট বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্ডিয়া জোট জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে দিল্লিতে বড় আন্দোলনের পথে নেমেছে, এবং রাহুল গান্ধীও পডকাস্টে বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের উচিত পদত্যাগ করে রাজসাক্ষী হওয়া।
শুক্রবার তামিলনাড়ুতেও নজরকাড়া ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অর্চনা পট্টনায়ক এসআইআর নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিলেন; কিন্তু সেখান থেকে শাসক টিভিকে, তার জোটসঙ্গী এবং বিরোধী ডিএমকে, সবাই ওয়াকআউট করেন। টিভিকে মন্ত্রিসভার সদস্য নির্মল কুমার বলেন, শুরু থেকেই তাঁরা এসআইআরের বিরোধিতা করছেন। তাঁর দাবি, এসআইআর না হলে ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় টিভিকে ১৬০টি আসনে জয়ী হতো, যেখানে তারা জিতেছে ১০৮টি।
চেন্নাইয়ে কয়েকদিন আগেই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে হাজার হাজার মানুষের মিছিল বেরিয়েছে। বিজেপি ছেড়ে নতুন দল 'উই দ্য লিডার্স' গঠন করা সাবেক সভাপতি আন্নামালাইও বলেছেন, ককরোচরা ন্যায়সংগত আন্দোলন করছে এবং তিনি তাদের সমর্থক।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী
১৯৭১ সালে আমরা শিখেছিলাম, ভোটাধিকার আর জনগণের হাতে ক্ষমতা কাগজে কলমে থাকলেই হয় না; তা রক্ষা করতে হয় সংগ্রামে। দিল্লির এই আন্দোলন আমাদের সেই স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব যেখানেই থাকুক, জনগণের ভোটের মর্যাদা সেখানেই হুমকির মুখে পড়ে। প্রতিবেশী ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এই টানাপোড়েন বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত: সার্বভৌম জাতির ভোট কোনো বাইরের নকশা বা অভ্যন্তরীণ কারসাজির হাতে ছেড়ে দেওয়া চলে না।
ভাষার প্রশ্নটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তে আমরা জাতি হিসেবে দাঁড়িয়েছিলাম, ভাষার মর্যাদা রক্ষায়। এসআইআর-প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যাঁরা ভয় পাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে বাংলাভাষী ভোটাররাও রয়েছেন; ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা ঘেঁটে বাদ দেওয়ার শঙ্কা আমাদের চেনা ইতিহাসের সঙ্গেই অনুরণিত।
পরবর্তী কর্মসূচি কী
সিজেপি নেতারা আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি এখনও ঘোষণা করেননি। সৌরভ দাস গণমাধ্যমকে বলেছেন, ক্রাইম ব্রাঞ্চে কবে আবার হাজিরার ডাক আসছে তার অপেক্ষায় তাঁরা আছেন; সেটি জানার পরই তাঁদের পরবর্তী আন্দোলন ঠিক হবে। অভিজিৎ দিপকে কর্মীদের বলেছিলেন উৎসবের মৌসুমে পরিবারের সঙ্গে থাকতে; ধারণা করা হচ্ছিল, দীপাবলির আগে নতুন কর্মসূচি আসছে না। শুক্রবারের গ্রেপ্তারের পর সেই হিসাব বদলে যেতে পারে।
সাধারণ প্রশ্ন
দিল্লির পিপলস মার্চে কী দাবি ছিল?
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর-প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি ছিল এই বিক্ষোভের মূল কথা। শতাধিক বিক্ষোভীকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশি সূত্রে জানানো হয়েছে।
বিক্ষোভীরা কীভাবে পুলিশের মোকাবিলা করেছেন?
পুলিশ ব্যারিকেডে বাধা দিলে তাঁরা হিংসার পথ না নিয়ে রাস্তায় বসে পড়েন, ঠিক যেভাবে আগেই ঘোষণা করেছিলেন। ফলে কোথাও হাতাহাতি বা বড় ধরনের বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেনি।
তামিলনাড়ুতে কী হয়েছে?
এসআইআর নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক থেকে শাসক টিভিকে ও বিরোধী ডিএমকে, দুই শিবিরই ওয়াকআউট করে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
