আগামী ২৩ থেকে ২৭ নভেম্বর তিন সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তুরস্ক সফরে যাচ্ছেন। প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দুর্যোগ মোকাবিলাসহ নানা ক্ষেত্রে তুরস্কের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা নেওয়াই এই সফরের মূল লক্ষ্য। সফরের যাবতীয় খরচ বহন করবে তুরস্ক সরকার।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক আদেশে সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একসঙ্গে তুরস্ক সফর ইতিহাসে আগে হয়েছে কি না, প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও মনে করতে পারেননি। বাংলাদেশের কূটনীতির মানচিত্রে এ এক নতুন বাঁক, যা আমাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে।
কারা যাচ্ছেন, কী নিয়ে যাচ্ছেন
প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। সঙ্গে থাকবেন ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারাও দলে রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত পাঁচ সদস্য জানিয়েছেন, যেসব খাতে তুরস্ক এগিয়ে, সেসব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা চাওয়া হবে। আলোচনায় থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ল্যাব স্থাপন, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (PTA) স্বাক্ষরের প্রস্তাব।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের গতিপথ
দুই দেশের সম্পর্ক কখনো মসৃণ ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রশ্নে তুরস্কের আপত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আমাদের জাতীয় আদালতের রায় ছিল জাতির ইতিহাসের এক অপরিহার্য অধ্যায়; সেই রায়ের স্বাধীনতা আমরা রাষ্ট্র হিসেবে সমর্থন করেছি এবং করব। তবে রাষ্ট্রহিতৈষিণী কূটনীতির দাবি হলো, ঐতিহাসিক প্রশ্নের পাশাপাশি বর্তমান স্বার্থও সুরক্ষা করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। বর্তমান সরকারের আমলেও তা অব্যাহত। গত ৫ ও ৬ জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব আরও গভীর করার আগ্রহ দেখান। ওই সফরে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যৌথ উৎপাদন ও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা: কী অর্জন সম্ভব?
২০২২ সালে ড্রোন সংগ্রহ নিয়ে তুরস্কি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী। গত জুলাইয়ে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে তুরস্কে যান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, তুরস্কের সহযোগিতায় বগুড়ায় একটি ড্রোন তৈরির কারখানা হবে, নির্মিতব্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে। দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিজের মাটিতে গড়ে তোলা, এটিই প্রকৃত সার্বভৌমত্বের পথ।
দুর্যোগসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাতে তুরস্কের প্রযুক্তি সহযোগিতা চাওয়া হবে; দেশটি নিজেদের দেশে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে মৃত্যুর হার কমাতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্প ও ভূমিধসের আগে সতর্কবার্তা পাওয়ার প্রযুক্তিও চাওয়া হবে তাদের কাছ থেকে।
রোহিঙ্গা ইস্যু ও স্বাস্থ্যখাতে সম্ভাবনা
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন সহায়তা দিয়ে আসছে তুরস্ক। দুর্যোগসচিবের তথ্যমতে, টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে আরও সহযোগিতা চাওয়া হবে। তুরস্কের অর্থায়নে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের আলোচনাও রয়েছে।
সফরের পরে কী হবে?
আগামী ১০ থেকে ১২ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় কপ৩১ শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে গত মাসের শুরুতে তুরস্ক সফর করেন বিরোধীদলীয নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। অর্থাৎ দুই দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে যোগাযোগ এখন নিরবচ্ছিন্ন।
আগামী বছর ২০ ও ২১ জানুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ-তুরস্ক যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (JEC) সভা হওয়ার কথা। সরকারি সূত্র বলছে, নভেম্বরের সফরে চিহ্নিত বিষয়গুলো নিয়েই জেইসি সভায় নানা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সফরকে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কেন এই সফর আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
একটি স্বাধীন জাতির পররাষ্ট্রনীতির শক্তি নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর। ১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি; সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে প্রয়োজন আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা সেই লক্ষ্যেই এগোতে পারে, যদি সরকার জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
তুরস্ক সফরে কতজন কর্মকর্তা যাচ্ছেন?
তিন সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সফর হবে ২৩ থেকে ২৭ নভেম্বর, খরচ বহন করবে তুরস্ক সরকার।
সফরে কী বিষয়ে আলোচনা হবে?
প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, রোহিঙ্গা সহায়তা এবং FTA ও PTA চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
প্রধানমন্ত্রী কি তুরস্কে যাচ্ছেন?
আগামী ১০ থেকে ১২ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় কপ৩১ শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক কেমন ছিল?
আওয়ামী লীগ আমলে যুদ্ধাপরাধ বিচারের মৃত্যুদণ্ড প্রশ্নে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গতি পেয়েছে।
