এয়ারবাস কেনা: বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের পরীক্ষা ও ইউরোপীয় অংশীদারত্বের নতুন অধ্যায়
ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বর্তমান সরকারের জন্য একটি 'ভালো পরীক্ষা'। জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিকাব টকের অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তিই করছে না, বরং ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।
বাংলাদেশের বিমান বহরে এয়ারবাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জানান, কয়েক বছর আগে কারিগরি মূল্যায়নের পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এয়ারবাস কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো তাদের বহরে এয়ারবাস এবং বোয়িং দুই ধরনের উড়োজাহাজই রাখে। এতে করে কোনো একক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এমন একটি উড়োজাহাজ রয়েছে যা ঢাকা থেকে বিরতিহীনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে পৌঁছাতে পারে। সেটি বোয়িং নয়, সেটি এয়ারবাস। বিশ্বে শুধু এই একটি উড়োজাহাজ তা করতে সক্ষম। তাই অনেক যৌক্তিক ও কারিগরি কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারবাসকে বেছে নিয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়।
দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের বার্তা
ফ্রান্স কিংবা ইউরোপ কোনো চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্কে বিশ্বাস করে না উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, 'আমি সবার জন্য সমান সুযোগের ওপর জোর দিচ্ছি এবং এটা এমন এক বার্তা, সেটা বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কেননা আমরা মনে করি, এটা অত্যাবশ্যক। আমি মনে করি, এটা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার এবং বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।'
তিনি আরও বলেন, এটা এমন নয় যে শুধু এয়ারবাস বিক্রি করলাম, এরপর শেষ। এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়া।
ইউরোপ: বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার
ইউরোপকে বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমেরিকায় ১৭ শতাংশের বিপরীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৪৮ শতাংশ যায় ইউরোপে। যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে এই অনুপাত আরও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, 'যখন আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করি, তখন কেবল একটা বিষয়ই স্মরণ করিয়ে দিই যে আমাদের অভিন্ন স্বার্থ হচ্ছে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। কেননা আপনার নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও আগ্রহী অংশীদার রয়েছে, যে আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়।'
বাংলাদেশের জন্য এয়ারবাস কেনা একটি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, ঢাকায় ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে শুধু ৭টি দেশের দূতাবাস রয়েছে। ভারত, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই করেছে ইইউ। কিন্তু সেই মানচিত্রে বাংলাদেশ নেই বা যথেষ্ট পরিমাণে নেই।
তিনি বলেন, 'সুতরাং আপনি যদি ওই মানচিত্রে আরও বড় পরিসরে থাকতে চান, তাহলে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। সেই বিবেচনায় এয়ারবাস গুরুত্ব বহন করে। কেননা এটা ইউরোপকে কেবল একটা বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা নয়; বরং সহযোগী হিসেবে বেছে নেওয়া।'
বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস আমাদের শেখায়, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সাহস রাখতে হয়। এয়ারবাস কেনা না কেনার এই সিদ্ধান্তও তেমনি একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্রদূত জানান, আলোচনা এখনো সঠিক পথেই এগোচ্ছে এবং তিনি আশাবাদী যে ইতিবাচক ফল আসবে। তিনি বলেন, 'আমি কারিগরি আলোচনার বিশদ বিবরণ দেব না। কারণ, সেই অনুমতি আমার নেই। আমি এয়ারবাসের হয়ে সরাসরি চুক্তি আলাপকারী নই। এটি কোনো ফরাসি সরকারের চুক্তি নয় বা যুক্তরাজ্য সরকারের চুক্তি নয়, এটি সরাসরি এয়ারবাস কোম্পানির চুক্তি, যা যথাসময়ে বিমান ও এয়ারবাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত হবে।'
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট। যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আমাদের জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এয়ারবাস কেনা হোক বা বোয়িং, সিদ্ধান্তটি হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পথচলা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও কূটনৈতিক অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করাই আমাদের লক্ষ্য। এয়ারবাস কেনার এই সিদ্ধান্ত যেমন ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করবে, তেমনি ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করে আমরা এগিয়ে যাব। আমাদের সিদ্ধান্ত হবে সাহসী, আমাদের পথ হবে স্বাধীন এবং আমাদের লক্ষ্য হবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সমৃদ্ধি।
এয়ারবাস কেনা নিয়ে বাংলাদেশের করণীয় কী?
- বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া
- ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা
- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কারিগরি সক্ষমতা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া
- আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার জন্য কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ