দুদক পুনর্গঠন: এনসিপির ওপর 'নিপীড়নের নতুন অধ্যায়', ক্ষোভে ফুঁসছে বিরোধী শিবির
সাত মাস পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বিরোধী দলকে টার্গেট করা হচ্ছে বলে তীব্র অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ১৯৭১ সালের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী দেশের মানুষ আজ আবারও দেখছে, ক্ষমতার দুর্বার মোহ কীভাবে একটি দেশের প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়।
নাহিদ ইসলামের চ্যালেঞ্জ: ২০০১-২০০৬ সালের দুর্নীতি তদন্তের দাবি
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাহস থাকলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হোক। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাস, বিরোধী মত দমন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের অভিযোগ তুলে এনসিপি আয়োজিত মানববন্ধনে এসব কথা বলেন তিনি। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
তারেক রহমানকে 'নতুন স্বৈরাচার' আখ্যা
বিএনপি সরকার দুদককে ধ্বংস করেছে এবং শেখ হাসিনার সরকারের মতোই প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে পুলিশ সংস্কার কমিশন না করা এবং পুলিশকে বিরোধী দল দমনে প্রস্তুত করার অভিযোগও করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনকে 'ভুলুণ্ঠিত' করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির নেতা।
গণতন্ত্র তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়, মানবাধিকারও তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারেক রহমান 'নতুন স্বৈরাচার' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তারেক রহমান শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারের পথে হাঁটলে তার আগেই দেশের মানুষ রাজপথে আন্দোলন করে তা প্রতিহত করবে। নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বিএনপি গত ১৬ বছর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে; কিন্তু ক্ষমতায় এসে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করছে এবং মানবাধিকার হরণ করছে।
মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় দেশবাসীর প্রতি আহ্বান
গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় দেশের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্রুত 'সঠিক পথে' ও গণতন্ত্রের পথে আসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কথা বলা, তাঁকে নিয়ে 'মিম' (ব্যঙ্গ) করা কিংবা তাঁকে গালি দেওয়া সন্ত্রাস নয়। প্রধানমন্ত্রীর নামে খারাপ ভাষা ব্যবহার ও কটূক্তিকে তাঁরা সমর্থন করেন না, এ কারণে দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে মানুষের কথা বলার অধিকার বন্ধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, 'তারেক রহমান কি বাংলাদেশের নতুন বিগ ব্রাদার?'
গুম, মানবাধিকার কমিশন ও সাইবার আইন নিয়ে এনসিপির উদ্বেগ
নাহিদ ইসলাম বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, এসআরবি এবং সামনে যে সাইবার সুরক্ষা আইন আনা হচ্ছে, এসব আইন নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেই করা হয়, তাহলে স্বাধীন তদন্ত সম্ভব নয়। আবার কোনো অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর শাস্তির বিধান রাখায় মানুষ গুমের ঘটনায় অভিযোগ করতেও ভয় পাবে।
'মানুষের কথা বলা বন্ধ করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ'
এনসিপি আহ্বায়কের দাবি, বিএনপি বিরোধী দলে থাকার সময় গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করলেও সরকারে এসে জাতীয় পর্যায়েও স্বাধীন তদন্তের সুযোগ রাখছে না। মানবাধিকার কমিশনকেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, পাঁচ মাস ধরে মিরাজ শেখের (বাগেরহাটের জেলে) কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ সরকারের মন্ত্রীরা গত সাত মাসে একটি গুমও হয়নি বলে বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, মিরাজ শেখের পরিবার থানায় মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি; পরে সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হলেও সেখানে কোস্টগার্ডের নাম লিখতে দেওয়া হয়নি।
একইভাবে এনসিপির সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর ও গাজীপুরের সিফাতের (প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার সিফাত আবদুল্লাহ) বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকার মানুষের কথা বলা বন্ধ করতে এই আইন ব্যবহার করছে। হবিগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্রশক্তির কর্মী আলিফের চোখ হারানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর যাত্রা: বিশ্ববাসীর কাছে কী জবাব?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার নিউইয়র্কে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির নেতারা গত ১৬ বছর জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কাছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে গেছেন। এখন দেশে এসব আইন করার পর তারা বিশ্ববাসীর সামনে কী জবাব দেবেন, সেটিই তাঁর প্রশ্ন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার এখন 'ভুলুণ্ঠিত' হচ্ছে। তাঁর দাবি, গুমের সঠিক তদন্ত, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে মতপ্রকাশের অধিকার যাতে হরণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আখতার হোসেনের অভিযোগ: আইনের নামে অপরাধীদের সুবিধা
মানববন্ধনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সরকার শক্তিশালী আইন করার কথা বললেও সংসদে এমন আইন এনেছে, যাতে অপরাধ দমন বা বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার বদলে অপরাধীরা সুবিধা পাবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হবে। গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত না হলে এবং মানবাধিকার কমিশন সরকারের ইচ্ছেমতো গঠিত হলে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যে মানবাধিকার কমিশন আইন তারা পাস করেছে, সেখানে সরকারি দলকে সব ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি এই আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ ফিরিয়ে এনে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন বাতিল, র্যাবের মতো বাহিনী যাতে নতুন করে গড়ে উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা আইনে নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা হরণ করে, এমন কোনো বিধান না রাখা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী: গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সংস্কার কমিশনসহ বিভিন্ন পক্ষের সুপারিশের পরেও সরকার আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পুরোনো কাঠামো নতুন মোড়কে ফিরিয়ে এনেছে। এ আইন সংশোধনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর কাউকে গুমের শিকার হতে দেওয়া হবে না। গুমসংক্রান্ত আইনে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, কাউকে গুম করা হলে সেই ঘটনায় তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছেই রাখা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীর পরিবার তদন্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে জবাবদিহি আদায়ের সুযোগ পাবে না। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, গুমের ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং তদন্তকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে এনসিপির যুবসংগঠন যুবশক্তি এবং ছাত্রসংগঠন ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।