সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নকিপুর জমিদারবাড়ি, এক সময়ের তিনতলা বিশাল প্রাসাদ, দশকের পর দশক অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংসের পথে। ছাদের বড় অংশ ধসে পড়েছে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে এসেছে ইট, আর ঘাস-আগাছায় ঢেকে গেছে স্থাপনার চিহ্ন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্যামনগর সদর থেকে পূর্ব দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ২১২ ফুট দীর্ঘ ভবনটির পূর্ব পাশের অধিকাংশ দেয়াল ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে।
একটি জাতি তার ইতিহাস হারালে তার আত্মপরিচয়ও হারায়। ১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, কিন্তু এই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের সাক্ষীগুলো আমরা রক্ষা করতে পারছি না। নকিপুরের এই ধ্বংসস্তূপ কেবল একটি পুরোনো ভবনের পতন নয়; এটি আমাদের সমষ্টিগত বিবেকের পরীক্ষা।
এক নজরে নকিপুর জমিদারবাড়ির অবস্থা
সাম্প্রতিক সফরে দেখা গেছে, পশ্চিম অংশের কিছু স্তম্ভ ও খিলান এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রাসাদের সামনের বিস্তীর্ণ মাঠ, পাশের বড় পুকুর, পাকা ঘাট আর নহবতখানার জৌলুশ এখন অতীত। পুকুরঘাটসংলগ্ন অষ্টকোনা দোতলা নহবতখানার অধিকাংশই ধসে গেছে; টিকে আছে কেবল দেয়ালের কিছু অংশ ও ভিত্তির অবশিষ্টাংশ। মাঠের দক্ষিণ পাশের জোড়া শিবমন্দির দুটি মাত্র তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে।
ভবনটির চারপাশ এখন কলাগাছ, ঘাস ও আগাছায় ঢাকা। জমিদারবাড়ির পাশের বাসিন্দা নয়ন হোসেন (২৫) ছোটবেলা থেকেই প্রাসাদের এই দশা দেখে আসছেন।
তিনি বলেন, অন্তত ১০ বছর আগেও যদি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে স্থাপনাটির অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব হতো। সংরক্ষণ করা গেলে পুরো এলাকাটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারত।
নয়ন হোসেন জানান, জমিদারবাড়ির ভেতরে আনোয়ারা বেগম (৫৬) ও ফাতেমা বেগম (৬২) নামের দুই নারী থাকেন; তাঁদের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
জমিদার হরিচরণ রায়ের ইতিহাস
নকিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো সাথী খাতুন। তাঁদের গবেষণার শিরোনাম 'মনুমেন্টস অ্যান্ড মেমোরি: দ্য আর্কিটেকচারাল ওয়ার্কস অব জমিদার হরিচরণ রায়', যা এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রুকলিন রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিশিং ইনস্টিটিউটের জার্নাল অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড আর্কিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
লেখক চারুচন্দ্র মণ্ডলের 'নকিপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস' বইয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে গবেষণায় বলা হয়েছে, জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী (১৮৬৬-১৯১৫) ছিলেন শ্যামনগর অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার। মুর্শিদাবাদ থেকে এসে তাঁর পূর্বপুরুষেরা বর্তমান সাতক্ষীরায় বসতি গড়েন বলে ধারণা করা হয়। হরিচরণের পৃষ্ঠপোষকতায় এলাকায় পুকুর খনন, সড়ক ও খাল নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মতো জনহিতকর কাজ হয়। ১৮৯৯ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নকিপুর মাইনর স্কুল আজ নকিপুর হরিচরণ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় নামে চলছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ১৮৮৮ সালে হরিচরণ রায় নকিপুরের জমিদারবাড়িটি তৈরি করেন। স্থানীয় কেউ কেউ বাড়িটিকে ২০০ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো বলেন, তবে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য বিবেচনায় গবেষকেরা এটিকে ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগের স্থাপনা মনে করেন। ৯২ নম্বর নকিপুর মৌজার ২ দশমিক ৯২ একর জমির ওপর নির্মিত প্রাসাদের জোড়া স্তম্ভ ও খিলানে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। চারুচন্দ্র মণ্ডলের বর্ণনা অনুযায়ী, ভবনে মোট কক্ষ ছিল ৩৯টি: নিচতলায় ১৭, দ্বিতীয় তলায় ১৭ ও তৃতীয় তলায় ৫টি।
১৯৫০ থেকে ১৯৭১: পতনের পথে
১৯৫০ সালে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হলে হরিচরণ রায়ের উত্তরাধিকারীরা আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৯৭১ সালে পরিবারের সর্বশেষ উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি একেবারে অযত্নে পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে স্থাপনা; এক সময়ের মূল্যবান সামগ্রীও চুরি ও লুটপাট হয়।
এই বছরটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে গভীর অর্থ বহন করে। যে বছর আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়েছি, সেই বছরই এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার শেষ মালিকদের ছেড়ে একা হয়ে যায়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র এই সম্পদের দিকে তাকায়নি।
নহবতখানা সম্পর্কে গবেষণায় বলা হয়, ঔপনিবেশিক আমলের জমিদারবাড়িতে এ ধরনের স্থাপনা খুব প্রচলিত না হলেও বাংলাদেশের স্থাপত্যের ইতিহাসে এর নজির আছে। স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো এলাকার রাজা বা সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির প্রাসাদে যেখানে সকাল-সন্ধ্যায় বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো, সেটিই নহবতখানা। নকিপুরের নহবতখানার একটি পুরোনো ছবি মিজানুর রহমানের 'সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি' বইয়ে সংরক্ষিত আছে।
কেন সংরক্ষণ জরুরি
জমিদারবাড়ির স্তম্ভ, খিলান, জোড়া শিবমন্দির ও অষ্টকোনা নহবতখানা স্থাপনাটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে বলে মনে করেন গবেষক শহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম সাতক্ষীরার ইতিহাস ও স্থাপত্য-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।
এই কথাটির গভীরতা উপলব্ধি করা দরকার। আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানুক, এটা আমরা চাই; কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা কেবল বইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। পাথরে-ইটে নির্মিত এই স্থাপনাগুলোই তো ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালা। নকিপুর হারিয়ে গেলে সাতক্ষীরার অতীত প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে কীভাবে?
প্রশাসনের পদক্ষেপ
সংরক্ষণ বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর মধ্যে নকিপুর জমিদারবাড়ি অন্যতম। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অধিদপ্তর থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, আশা করছি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এই অগ্রগতি স্বাগত্য, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: কেন এত দেরি? ৯২ একর জমির প্রাসাদ নয়, মাত্র ২ দশমিক ৯২ একরের এই স্থাপনা রক্ষায় একটি চিঠির জন্য কুড়ি বছরের বেশি সময় লাগল কেন? রাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষায় দেরির প্রতিটি বছর মানে অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রায়শ্ন
নকিপুর জমিদারবাড়ি কোথায় অবস্থিত?
সাতক্ষীরার শ্যামনগর সদর থেকে পূর্ব দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ৯২ নম্বর নকিপুর মৌজায় এই জমিদারবাড়ি অবস্থিত।
নকিপুর জমিদারবাড়ি কে এবং কখন তৈরি করেন?
গবেষণা অনুযায়ী, জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী ১৮৮৮ সালে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ভবনে মোট ৩৯টি কক্ষ ছিল।
জমিদারবাড়িটি ধ্বংস হওয়ার কারণ কী?
১৯৫০ সালে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্তির পর মালিকপক্ষ আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ১৯৭১ সালে শেষ উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় চলে গেলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে।
সংরক্ষণের উদ্যোগ কতদূর?
জেলা প্রশাসন সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে এবং অধিদপ্তরের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে, জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ।
