নিজের পরিচয়ের সন্ধানে এগোচ্ছেন পপ তারকা ম্যাডোনার জ্যেষ্ঠ কন্যা লর্দেস লিওন। ৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নতুন একক গান 'ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প', আর সেই গানের প্রচারণায় সাহসী এক ফটোশুটেও ধরা দিয়েছেন এই ৩০ বছরের শিল্পী। খোলামেলা পোশাকে তাঁর কয়েকটি ছবি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
প্রথম আলো জানিয়েছে, ফটোশুটের পেছনে শুধু চমক তৈরির বা বিজ্ঞাপনের হিসাব নেই; গানটির বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। লর্দেসের ভাষ্য, 'ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প' মূলত নারী এবং নিজের ইচ্ছেমতো জীবন যাপন করা মানুষদের ঘিরে তৈরি নেতিবাচক ধারণা থেকে মুক্তির গল্প। একটি স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজের গল্প নিজের ভাষায় বলার এই সাধনা আমাদের জাতীয় চেতনার সঙ্গেও সাংগীতিকভাবে মিলে যায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির ইতিহাস যে মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়ে, তা হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। শিল্পী হিসেবে লর্দেসের সংগ্রামও সেই একই মানবিক সত্যের অন্য প্রকাশ।
নতুন গান ও সাহসী উপস্থাপনা
সংগীতজগতে লর্দেস পরিচিত 'লোলা লিওন' নামে। নতুন গানটির প্রচারণার জন্য আলোকচিত্রী এলিজাভেতা পোরোদিনার ক্যামেরায় বেশ সাহসী রূপে হাজির হয়েছেন তিনি। একটি ছবিতে কালো স্বচ্ছ লেসের বডিস্যুট ও উঁচু প্ল্যাটফর্ম হিল পরে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে পোজ দিয়েছেন লর্দেস। অন্য ছবিতে শরীরের ওপরের অংশের পোশাক তুলে ধরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। ছবিগুলোর উপস্থাপনায় রয়েছে তাঁর নিজস্ব ফ্যাশন বোধের ছাপ।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল জানিয়েছে, মায়ের পথ ধরেই সাহসী গান ও উপস্থাপনায় এগোচ্ছেন ম্যাডোনার এই কন্যা। ইয়াহুও তাদের প্রতিবেদনে ৪ নভেম্বর প্রকাশিত গানটির প্রচারণামূলক ছবির কথা উল্লেখ করেছে।
গানের ভেতরের কথা
লর্দেসের ব্যাখ্যায়, গানটিতে উঠে এসেছে প্রজন্মান্তরের মানসিক ক্ষত, জাদুবিদ্যা এবং নারীত্বের নানা বৈপরীত্য। নিজের পারিবারিক ইতিহাসে যাঁরা কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের স্মরণ ও সম্মান জানানোর ইচ্ছাও ছিল তাঁর। অর্থাৎ এটি কেবল একটি পপ গান নয়; নিজের শিকড় আর পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা।
গানটি লিখেছেন লর্দেস ও সংগীত প্রযোজক অস্কার শেলার। প্রযোজনার দায়িত্বেও ছিলেন শেলার, যিনি পিংকপ্যান্থারেস, লিলি অ্যালেন ও কেলেলার মতো শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন। গানটি প্রকাশিত হয়েছে আটলান্টিক রেকর্ডস থেকে। স্বাধীন সংগীতচর্চা দিয়ে যাত্রা শুরু করা লর্দেসের ক্যারিয়ারে এটি নতুন এক অধ্যায়।
নাম বদলে নতুন সংগীতযাত্রা
লর্দেসের সংগীতজীবন শুরু ২০২২ সালে। 'লোলাহল' ছদ্মনামে প্রকাশ করেন প্রথম একক গান 'লক অ্যান্ড কি', শিল্পী আর্থ-আটারের স্বাধীন লেবেল ক্যামিক্যাল এক্স থেকে। গানের ভিডিও পরিচালনা করেন আর্থ-আটার, কোরিওগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন লর্দেস নিজে। একই বছর বেরোয় তাঁর প্রথম ইপি 'গো'।
২০২৪ সালে জিকিউকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর সংগীতচর্চার ভিন্নধর্মী দিক উঠে আসে। নিউ অরলিন্সে শিল্পী আবাসন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সেখানকার জ্যাজ সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে পরিবেশনাও করেছিলেন তিনি।
২০২৬ সালে নিজের আসল নামেই গান প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন লর্দেস। মে মাসে প্রকাশ করেন 'টি-শার্ট', যেটি ডব্লিউ সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাতে তিনি বর্ণনা করেন একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার গল্প হিসেবে। গানের ভিডিওতে রেখেছিলেন পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের। তাঁর কাছে বন্ধুত্ব ও পারিবারিক সম্পর্ক মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় শক্তি।
ফ্যাশন ও নাচেও আলাদা পরিচয়
সংগীতের বাইরে ফ্যাশনজগতেও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন লর্দেস। মিউ মিউ, ইভ সাঁ লরাঁ, মার্ক জ্যাকবস, বারবেরি, ক্যালভিন ক্লেইন ও মুগলারের মতো ব্র্যান্ডের প্রচারণায় কাজ করেছেন তিনি। ভার্সাচে ও বটেগা ভেনেতার মতো ফ্যাশন হাউসের র্যাম্পেও হেঁটেছেন। এন্টারটেইনমেন্ট নাউ জানিয়েছে, সদ্য ৩০ পার করা শিল্পী এই বয়সেই নিজের সাহসী উপস্থাপনাকে আপন করে নিয়েছেন।
নাচের প্রশিক্ষণও তাঁর শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিউইয়র্কের লা গার্ডিয়া হাইস্কুলে পড়ার পর ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ও পারচেজ কলেজে পড়েছেন তিনি। মঞ্চ পরিবেশনা ও কোরিওগ্রাফির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন নিজের গানের ভিডিওতেও।
ম্যাডোনার সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলল যেভাবে
লর্দেসের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে মা ম্যাডোনার প্রসঙ্গ। ২০২১ সালে ইন্টারভিউ সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাতে মাকে 'কন্ট্রোল ফ্রিক' বলেছিলেন তিনি। উচ্চমাধ্যমিক শেষে যত দ্রুত সম্ভব মায়ের কাছ থেকে আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন; কলেজের বেতন ও প্রথম অ্যাপার্টমেন্টের খরচও নিজেই বহন করেছেন। তাঁর যুক্তি, মা-বাবা সন্তানের সব খরচ বহন করলে অনেক সময় তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে।
তবে বিখ্যাত পরিবারের সন্তান হিসেবে পাওয়া সুযোগ-সুবিধাও তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর মতে, সেই সুবিধা যেমন সত্য, নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জও তেমনি বাস্তব।
ম্যাডোনাও একাধিকবার মেয়ের স্বাধীন পথচলা নিয়ে কথা বলেছেন। চলতি বছরের জুনে গ্রাহাম নর্টনের অনুষ্ঠানে তিনি জানান, লর্দেস দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না; মায়ের পরিচয়ে বাড়তি সুবিধার ধারণা তৈরি হোক, তা চাননি মেয়ে।
দূরত্ব কমাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে 'দ্য টেস্ট' গানটি। ম্যাডোনার 'কনফেশনস টু' অ্যালবামের এই গানে প্রথমবারের মতো মা-মেয়ে একসঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন। গানে ম্যাডোনা মেয়ের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি অতীতের কিছু ভুলও স্বীকার করেছেন; লর্দেস তুলে ধরেছেন বিশ্বখ্যাত মায়ের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা। ম্যাডোনার ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা তাঁদের সম্পর্কের জন্য ছিল নিরাময়কারী।
মায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের পরিচয়
লর্দেসের জন্ম ১৯৯৬ সালে, ম্যাডোনা ও তাঁর তৎকালীন সঙ্গী কার্লোস লিওনের ঘরে। ছোটবেলা থেকেই মায়ের বিশ্বখ্যাতির কারণে তাঁকে ঘিরে ছিল সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ। কিন্তু সেই পরিচয়কে পুঁজি করে এগোনোর বদলে বরাবরই নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করেছেন তিনি। ২০২২ সালে প্রথম গান প্রকাশের সময়ও সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না লর্দেস। তাঁর যুক্তি ছিল, সংগীত তাঁর খুব পরিচিত জগৎ, কারণ মা এই জগতেরই মানুষ; তাই নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার আগে অন্যদের তৈরি করে দেওয়া পরিচয়ে আটকে যেতে চাননি তিনি।
এই চেতনাটুকুই লর্দেসের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। পরিচয় অন্যে দেয় না, পরিচয় অর্জন করতে হয়; এই সত্য ব্যক্তি জীবনে যেমন, জাতির জীবনেও তেমনি। যে জাতি ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে নিজের পতাকা অর্জন করেছে, স্বাধীনতার এই মূল্যবোধ তার সংস্কৃতিবোধেরও অংশ।
পাঠকের প্রশ্ন
লর্দেস লিওনের নতুন গানটির নাম কী?
গানের নাম 'ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প', যা ৪ নভেম্বর আটলান্টিক রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
লর্দেস কি আগেও গান প্রকাশ করেছেন?
হ্যাঁ। ২০২২ সালে 'লোলাহল' নামে তাঁর প্রথম গান 'লক অ্যান্ড কি' বেরিয়েছিল। ২০২৬ সালের মে মাসে নিজের আসল নামে প্রকাশ করেন 'টি-শার্ট'।
ম্যাডোনা ও লর্দেস কি কখনো একসঙ্গে গেয়েছেন?
ম্যাডোনার 'কনফেশনস টু' অ্যালবামের 'দ্য টেস্ট' গানে প্রথমবারের মতো মা-মেয়ে একসঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন।
