বিশ্বকাপ ফুটবল: প্রতিরোধের ঢাল হাতে মরক্কো, ক্লান্ত ব্রাজিলের কষ্টার্জিত ড্র
ছবি: বিবিসি
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের যাত্রা শুরু করেছে সর্বাধিক পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে শুরুটা মোটেই আশানুরূপ হয়নি। নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে গ্রুপ সি-এর প্রথম ম্যাচে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিল ১-১ গোলে ড্র করেছে। এই ড্র শুধু একটি পয়েন্ট নয়, বরং একটি অবলম্বনহীন দলের প্রতিরোধের ইতিহাস। মরক্কোর সংগ্রামী ফুটবল প্রমাণ করেছে, স্বাধীনতার তৃষ্ণা আর সুসংগঠিত প্রতিরোধ যেকোনো পরাশক্তিকে রুখে দিতে পারে।
বিপরীতমুখী ফুটবলে মরক্কোর প্রতিরোধ আর ব্রাজিলের সমতা
রববার নিউজার্সি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ব্রাজিলকে চাপে রাখে মরক্কো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন অস্ত্র হাতে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন, মরক্কোর খেলোয়াড়রাও মনে হলো সেই একই তাগিদে মাঠে নেমেছে। প্রথম দশ মিনিটেই ব্রাজিলের গোলপোষ্ট লক্ষ্য করে পাঁচটি শট নেয় তারা, যা গোলরক্ষক আলিসন প্রতিহত করেন। তবে, ২১ মিনিটের মাথায় ব্রাজিলের রক্ষণ ভেঙে পড়ে। মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ দুই সেন্টারব্যাকের মাঝে দুর্দান্ত একটি থ্রু বল দেন ইসমাইল সাইবারিকে, যিনি ফাঁকা জায়গা পেয়ে আলিসনের মাথার ওপর দিয়ে গোল করেন।
খেলার ধারার অনেকটা বিপরীতেই ৩২তম মিনিটে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের দারুণ দক্ষতায় সমতাসূচক গোল পায় ব্রাজিল। বাম প্রান্তে ব্রুনো গুইমারেসের সঙ্গে ওয়ান-টু করে বল নিয়ে দ্রুত পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন ভিনিসিয়ুস। এরপর জায়গা বের করে নিয়ে বক্সের বাঁ দিক থেকে ডান পায়ের এক জোরালো এবং চমৎকার বাঁকানো শটে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে পরাস্ত করে সোজা জালের ওপরের কোণায় বল জড়িয়ে দেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলগত যুদ্ধ এবং ব্রাজিলের সংকট
সমতা ফেরার পর দুইদলেরই কিছুটা রক্ষণশীল ফুটবল খেলায় বিরতির আগে আর তেমন সুযোগ তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে খেলা হয়ে ওঠে আরও শারীরিক ও কৌশলগত। উভয় কোচ একাধিক পরিবর্তন আনেন, এবং জয়ের চেয়ে পরাজয় ঠেকিয়ে দেওয়াটাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ নেয় মরক্কো এবং শেষদিকে ভালো সুযোগ তৈরি করে। তবে গোলরক্ষক আলিসন বেকারের দৃঢ়তায় ব্রাজিল এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারে।
ব্রাজিলের মাঝমাঠের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় কাসেমিরো ছিলেন নিষ্প্রভ। প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড দেখে বিরতির সময় তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। বদলি নামা ফাবিনহো কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন। আক্রমণভাগের একমাত্র স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো হতাশ করেছেন। প্রথমার্ধে একটি সহজ হেড মিস করেন তিনি। রক্ষণে রজার ইবানিয়েজও ভুগেছেন। মরক্কোর গোলের সময় তিনি পজিশনের বাইরে ছিলেন এবং সারাক্ষণই কিছুটা অস্থিরতা দেখিয়েছেন। বার্সালোনার সুপারস্টার রাফিনিয়াও এদিন ছিলেন ছন্নছাড়া। বক্সের মধ্যে একটি ভালো সুযোগ পেয়েও তিনি সরাসরি গোলকিপারের দিকে দুর্বল শট নেন।
স্বাধীনতার চেতনায় মরক্কোর জয়যাত্রা আর ব্রাজিলের শিক্ষা
মরক্কো এই ম্যাচে শুধু প্রতিরোধই করেনি, বরং দাপটও দেখিয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে দলটির সেমিফাইনালে খেলা কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। গত বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বোনো এবারও ভালো ফর্মে। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির নেতৃত্বে দলের রক্ষণভাগ ছিল দৃঢ় এবং ডিসিপ্লিন্ড। ব্রাজিলের দুইজন হলুদ কার্ড দেখলেও মরক্কোর কেউ হলুদ কার্ড দেখেনি। এইবারের আসরেও দলটি অনেকদূর যাবে বলে মনে হচ্ছে।
ম্যাচের পর মরক্কোর কোচ মোহামেদ ওয়াহবি বলেন, আনচেলোত্তির ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলা সহজ ছিল না এবং তারা তাদের কৌশলগত পরিকল্পনার অনেকটাই বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন। নিউ জার্সির গ্রীষ্মের তীব্র গরম শারীরিক সক্ষমতাকে বড় ভূমিকায় ফেলেছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তবে এই গরমের মধ্যেও মরক্কোর প্রস্তুতি যথাযথ ছিল।
ব্রাজিলের সুপারস্টার নেইমার এই ম্যাচে অনুপস্থিত ছিলেন। কাফ ইনজুরি থেকে এখনো পুরোপুরি সেরে না ওঠায় তাকে খেলানো হয়নি। কোচ কার্লো আনচেলোত্তি জানিয়েছেন, হাইতির ম্যাচের আগে তাকে পাওয়া যাবে না। আনচেলোত্তি নিজেই বলেছেন,
দলটি শেষ মিনিট পর্যন্ত প্রাণপণ লড়াই করেছে। আমাদের যে আরও ভালো করতে হবে তা স্পষ্ট। আমি হতাশ নই, তবে সন্তুষ্টও নই। কাজ করতে হবে। মরক্কো ভালো খেলেছে, এটি কঠিন ম্যাচ ছিল।
ব্রাজিলের জন্য কী ইঙ্গিত রয়েছে এই ম্যাচে?
এই ম্যাচ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
- নেইমারের প্রত্যাবর্তন: তিনি ফিট হয়ে ফিরলে ব্রাজিলের সৃজনশীলতা ও আক্রমণের বৈচিত্র্য বাড়বে, যা মরক্কোর বিরুদ্ধে অনুপস্থিত ছিল।
- মাঝমাঠের সমস্যা সমাধান: কাসেমিরোর বয়স ও ফর্মহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্রুনো গুইমারায়েস ও ফাবিনহোর কম্বিনেশন বা অন্য বিকল্প খুঁজতে হবে আনচেলোত্তিকে। মরক্কো মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে রক্ষণের ওপর দারুণ চাপ ফেলেছে।
- ভিনিসিয়ুস একক ভরসা নন: তার ব্যক্তিগত মানের ওপর নির্ভর করে দুই একটি ম্যাচ জেতা বা পয়েন্ট বাঁচানো সম্ভব, কিন্তু তা টুর্নামেন্ট জয়ের জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়। রাফিনিয়া, পাকেতা ও কুনিয়াকে আরও কার্যকর হতে হবে।
- গ্রুপ পর্বের পথ: পরের ম্যাচ ২০ জুন হাইতির বিরুদ্ধে ফিলাডেলফিয়ায়, যা ব্রাজিলের জন্য তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ। গ্রুপ সি থেকে নকআউটে যাওয়া কঠিন হবে না, যদি দল মাঝমাঠের সমস্যা ও গরমের সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
ব্রাজিল যদি প্রথম ম্যাচের ঘাটতিগুলো পোষাতে না পারে, তবে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড বা পর্তুগালের মতো দলগুলোর সাথে নকআউট পর্বে মুখোমুখি হলে আশাব্যঞ্জক ফল করতে পারবে না। পরাশক্তির কাছে মাথা নত না করে যেকোনো সংকটে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শিক্ষা আমরা মুক্তিযুদ্ধ থেকেই পেয়েছি। ব্রাজিলের এই কষ্টার্জিত ড্র আমাদের সেই চেতনাই মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতার লড়াইয়ে টিকে থাকার শক্তিই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রা কতদূর যাবে?
ব্রাজিলের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে মরক্কোর এই লড়াই প্রমাণ করে, দৃঢ় মনোবল থাকলে কোনো শক্তিই অপ্রতিরোধ্য নয়। আর্জেন্টিনা ২০২২ সালে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ব্রাজিলের জন্যও সেই সুযোগ এখনো খোলা আছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন নিজেদের ভেতরের শক্তি আর সংগঠনকে নতুন করে চিনতে।
মরক্কো কেন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এতটা সফল হলো?
মরক্কো দৃঢ় রক্ষণ আর সুসংগঠিত কৌশলের মাধ্যমে ব্রাজিলের আক্রমণ রুখে দেয়। তাদের এই প্রতিরোধ ক্ষমতা ২০২২ সাল থেকেই বিশ্বকাপে পরিচিত। অধিনায়ক হাকিমির নেতৃত্বে তারা মাঠে যে স্বাধীনতার স্পিরিট দেখিয়েছে, তা যেকোনো যুদ্ধে জয়ের পূর্বশর্ত।
নেইমার কবে মাঠে ফিরবেন?
কাফ ইনজুরি থেকে এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেননি নেইমার। কোচ আনচেলোত্তির মতে, ২০ জুন হাইতির বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে তাকে পাওয়া যাবে না।