আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ: প্রসিকিউশনের জবাব
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) সম্প্রতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ট্রাইব্যুনাল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলাম এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এই প্রতিবেদন সঠিক তথ্যভিত্তিক নয় বরং কিছু আসামির প্রভাবে তৈরি করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল অভিযোগ কী?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা চান মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার যেন যথাযথ সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়। সংস্থাটি বলছে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিচারকরা তদন্ত কর্মকর্তাদের নথিভুক্ত করা এমন সাক্ষ্য বিবৃতির ওপর নির্ভর করছেন, যেগুলোর একাধিক বিবৃতিতে একই অনুচ্ছেদ পাওয়া গেছে। এতে সাক্ষ্য বিবৃতির সত্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ব্যর্থতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে, আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।”
প্রসিকিউশনের জবাব: ‘বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এই রিপোর্ট’
চিফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আমি তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি। অনেক যাচাই বাছাই শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারা শাপলা চত্বর মামলা ও চট্টগ্রামের এক মামলা অভিযুক্তদের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। কারও প্রতি অ্যাফিলিয়েশন থেকে তারা এই রিপোর্ট করতে পারে। আমি মনে করি বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তারা।”
তিনি আরও বলেন, “প্রসিকিউশনে ২০ বছরের কম অভিজ্ঞ কোনো আইনজীবী নেই। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আছেন। সব ভিডিও ফুটেজ দ্বারা প্রমাণিত। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত। তার আর কোন মানদণ্ড খুঁজছেন আমি জানি না।”
ট্রাইব্যুনালের বর্তমান কার্যক্রম ও প্রেক্ষাপট
ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার করছে। ওই আন্দোলনে ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের ফলেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ৬টি মামলার বিচার সম্পন্ন করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে হয়েছে, যার মধ্যে শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এছাড়া ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ বিষয়ে আর কোনো সংশোধন আনা হয়নি।
সাংবাদিক গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিজ্ঞপ্তিতে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের এক সমাবেশ নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের কারণে গত ১৪ই মে ট্রাইব্যুনালের দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের আইনজীবীরা জানান, প্রসিকিউটররা তাদের গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানাননি। এটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তির (ICCPR) এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের পরিপন্থি।
২৭শে জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে ওই দুই সাংবাদিকসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের চেতনা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। তখন বিচারের পর ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে পাঁচজন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং একজন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, “সেই বিচারগুলো প্রমাণের দুর্বলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে আঁতাত এবং মৌলিক ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার অভাবের কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।”
সবশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠন করে একই ট্রাইব্যুনাল। পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায় দেওয়া হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে। রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
উপসংহার: ন্যায়বিচার বনাম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা
মীনাক্ষী গাঙ্গুলীকে উদ্ধৃত করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের উপলব্ধি করা উচিত যে তারা অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বিচার পুনরাবৃত্তি করতে পারে না। একই ধরনের সাক্ষ্যবিবৃতির ওপর ভিত্তি করে আনা অভিযোগ একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার অভাবকে স্পষ্ট করে। এর ফলে আবারও ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।”
অন্যদিকে, চিফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেছেন, “আমি তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি। অনেক যাচাই বাছাই শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ইতিহাসে ন্যায়বিচারের এই দ্বন্দ্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা জরুরি, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো সুযোগ না থাকে।