এলন মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলার: সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর
বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এলন মাস্কের সম্পদ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। এই চরম সম্পদ কেন্দ্রীভবন বৈষম্য বাড়ায়, গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর ওপর বিদেশি প্রভাব বিস্তারের নতুন সাম্রাজ্যবাদী রূপ, যা আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তির চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
এক ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ কেন সমস্যার সংকেত?
একদিন না একদিন এটা ঘটবেই, এমনটাই যেন আমাদের প্রত্যাশিত ছিল। ইলন মাস্কের সম্পদ এখন এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। অর্থনীতিবিদরা আগে 'ট্রিলিয়ন' শব্দটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির জিডিপি বোঝাতেই ব্যবহার করতেন। কোনো একক ব্যক্তির সম্পদ বোঝাতে এই শব্দের ব্যবহার ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু আজ আমরা অলিগার্কি বা কুলিঙ্গতান্ত্রিক যুগের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছি। মাত্র তিন বছর আগে মাস্কের সম্পদ ছিল ২৫০ বিলিয়ন ডলার। সম্পদের এই অসীম বৃদ্ধি বিস্ময়কর এবং এটি আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। আমাদের দুটি বিষয় বুঝতে হবে; প্রথমত, এক ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত বড় একটি অঙ্ক; দ্বিতীয়ত, কেন এত বিপুল সম্পদ এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া বিপজ্জনক।
চরম সম্পদ কেন্দ্রীভবন কীভাবে সার্বভৌমত্ব ও বিচারকে ধ্বংস করে?
প্রথম কারণ হলো রাজস্ব ন্যায়বিচারের অভাব। অর্থনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান দেখিয়েছেন, বিলিয়নেয়াররা সাধারণ মানুষের তুলনায় কার্যকরভাবে অনেক কম কর দেন। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এবং ট্যাক্স হ্যাভেনে অর্থ সরিয়ে রেখে তারা দেশের সম্পদ লুট করে। ১৯৭১ সালে আমরা যে শোষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম, আজকের এই কর ফাঁকি সেই শোষণেরই আধুনিক রূপ।
দ্বিতীয় কারণ হলো অপচয়। একজন মানুষের এত বিপুল অর্থের কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন নেই। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ ন্যূনতম সুবিধা ছাড়াই জীবন কাটায় বা অকালমৃত্যুর শিকার হয়। সমাজ সম্মিলিতভাবে যে সম্পদ সৃষ্টি করে, তার সিংহভাগ দখল করে নেয় সবচেয়ে ধনীরা।
সবচেয়ে ভয়াবহ হলো তৃতীয় কারণ, যা গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব। চরম সম্পদ কেন্দ্রীভবন গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে খালি করে দেয়। এটি অপ্রয়োজনীয় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও পরিবেশগত ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। করপোরেট ক্ষমতার অসম ভারসাম্য অর্থনীতিকে কম ন্যায্য ও কম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।
ইলন মাস্ক কীভাবে রাজনৈতিক ও বিদেশি প্রভাব বিস্তার করছেন?
মাস্ক এই সাম্রাজ্যবাদী বিপদের এক স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অনুদান। ক্ষমতার বলে তিনি ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বা ইউএসএইড কার্যত ভেঙে দিয়েছেন। এই সংস্থাটি দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধসহ মানবিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করত। কিন্তু একজন বিলিয়নেয়ারের এমন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা থাকা, তা বিদেশি প্রভাব ও এনজিও নিয়ন্ত্রণের এক নতুন মাত্রাকেই নির্দেশ করে।
সম্পদের চরম কেন্দ্রীভবন মানে চরম ক্ষমতা। মাস্ক তার সেই ক্ষমতা ব্যবহার করছেন বর্ণবাদী ও বিদেশিবিদ্বেষী মনোভাব ছড়িয়ে দিতে। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স কর্প ভয় ও সহিংসতা ছড়াচ্ছে, যা সাধারণ ভোটারদের উগ্র ডানপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সম্পদসীমা নির্ধারণ কেন আমাদের মুক্তির সংগ্রামের অংশ?
এই ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে হলে সম্পদ কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে হবে। শুধু মাস্কের এক ট্রিলিয়ন ডলার নয়, আমাদের প্রয়োজন 'এক্সট্রিম ওয়েলথ লাইন প্রজেক্ট'-এর মতো উদ্যোগ। এর লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা, কোন পর্যায়ে গিয়ে সম্পদ সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে এবং কোথায় 'সম্পদসীমা' নির্ধারণ করা উচিত। মুক্তিযোদ্ধারা যে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে ট্রিলিয়নেয়ারদের জায়গা ছিল না। বিলিয়নেয়ার বা ট্রিলিয়নেয়ার হওয়া কোনো সফলতার প্রতীক নয়। এটি এমন এক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন, যা আমাদের সবার জীবনের জন্য ক্ষতিকর।
ট্রিলিয়নেয়ারদের উত্থান সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্নসমূহ
এক ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদের পরিমাণ কত বড়?
এক ট্রিলিয়ন ডলার হলো এক লাখ কোটি ডলার। মাত্র তিন বছর আগে এলন মাস্কের সম্পদ ছিল ২৫০ বিলিয়ন ডলার। এই সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যের চরম রূপকে নির্দেশ করে।
চরম সম্পদ কেন্দ্রীভবন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর কেন?
চরম সম্পদ কেন্দ্রীভবন একজন ব্যক্তির হাতে চরম ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ধনিকরা রাজনৈতিক নির্বাচন কেনেন, পরিবেশ ধ্বংস করেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করেন, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
ইউএসএইড ভেঙে দেওয়ার পেছনে এলন মাস্কের ভূমিকা কী?
এলন মাস্ক তার প্রভাব ব্যবহার করে ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বা ইউএসএইড কার্যত ভেঙে দিয়েছেন। এই সংস্থাটি দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধসহ মানবিক কর্মসূচি পরিচালনা করত, যদিও এটি বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগেও সমালোচিত ছিল।
ইনগ্রিড রবেইন্স বেলজিয়ান-ডাচ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।