মুক্তির বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বলিউডের পর্দায় এক বাঙালি মেয়ের সংগ্রামের গল্প শুনে চোখ ভিজে যায়। 'মুসাফির ক্যাফে' ওয়েব সিরিজের নায়িকা মহিমা মকবানা। তিনি আজ বলিউডের আলোচিত মুখ। কিন্তু তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল মুম্বইয়ের একচালা ঘরে। পাঁচ মাস বয়সে বাবা হারিয়ে, মায়ের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়ে আজ নিজের উপার্জনে কিনেছেন বাড়ি-গাড়ি।
মহিমার বাবা ছিলেন একজন নির্মাণকর্মী। ১৯৯৯ সালে কিডনির সমস্যায় তিনি মারা যান। তখন মহিমার বয়স মাত্র পাঁচ মাস। দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন সংগ্রাম শুরু করেন তাঁর মা। স্থানীয় এক সমাজসেবী সংস্থায় চাকরি নেন তিনি। মুম্বইয়ের একচালা ঘরে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন মহিমা। খুব ছোট বয়স থেকেই পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে।
মহিমা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বালিকা বয়সে স্কুল শেষ করে তিনি প্রায় পুরো মুম্বইয়ের রাস্তা বাসে চষে বেড়াতেন। অডিশনের জন্য। মায়ের স্বপ্ন ছিল অভিনয় করার। কিন্তু অর্থাভাব ও সুযোগের অভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই নিজের স্বপ্ন মেয়ের মাধ্যমে বাঁচাতে চেয়েছিলেন মহিমার মা।
নায়িকা হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না মহিমার। বলিউডের নড়িনক্ষত্র সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। শুধু পরিবারের খরচ জোগানো আর মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্যই তিনি অডিশন দিতেন। স্কুলের পর অডিশন দিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতেন। তখন চোখ বুজে আসত তাঁর।
মায়ের স্বপ্ন ছিল, তিনি মারা যাওয়ার আগে তাঁর মেয়ে নিজের উপার্জনে একটি বাড়ি কিনবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন মহিমা। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে অডিশন দেওয়া শুরু করেন তিনি। টেলিভিশনের বহু বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন। 'মোহে রং দে' ধারাবাহিকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় পা রাখেন। 'বালিকা বধূ', 'মিলে জব হম তুম', 'আহট', 'সিআইডি'র মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নিজের উপার্জনে গাড়ি-বাড়ি কিনে ফেলেন তিনি।
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি কলেজ থেকে মাস মিডিয়া নিয়ে স্নাতক হন মহিমা। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'আমি ছোটপর্দার অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলাম। কিন্তু বড়পর্দার জন্যও বহু অডিশন দিচ্ছিলাম। কিন্তু ধারাবাহিকে কাজ করি বলে আমায় অনেকেই নীচু নজরে দেখতেন।'
বলিউডের 'ভাইজান' সলমন খানের সঞ্চালনায় 'বিগ বস'-এ অতিথি হিসেবে গিয়েছিলেন মহিমা। সেখানেই সলমনের সঙ্গে আলাপ হয়। সলমন তাঁকে নিজের ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ' ছবিতে দেখা যায় মহিমাকে। তেলুগু ভাষার ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি।
বর্তমানে মুম্বইয়ে দুটি বাড়ি রয়েছে মহিমার। ৩০ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি আছে তাঁর। তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি। 'মুসাফির ক্যাফে' সিরিজে অভিনয় করে তিনি ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছেন বলে খবর।
মহিমার জীবন আমাদের শেখায়, স্বাধীনতার চেতনা শুধু রাজনৈতিক নয়। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। একচালা ঘর থেকে বলিউডের সিংহাসনে ওঠা এই বাঙালি মেয়ে আমাদের গর্ব।