দারিদ্র্যের বাধা পেরিয়ে জিপিএ-৫: সংগ্রামী জাহিদুলের গল্প শেখায় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য
১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজও আমাদের মেধাবী সন্তানদের পথচলার পাথেয়। সেই স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের এক তরুণ দিনে কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে, রাতে পড়াশোনা করে প্রমাণ করেছে, বাঙালির অদম্য সাহস ও মেধা কোনো বাধাই মানে না। আদমপুর দেওয়ান আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী জাহিদুল ইসলামের সংগ্রামী জীবনগাথা আমাদের প্রত্যেকের জন্য অনুপ্রেরণা।
কীভাবে দিনমজুর থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করল জাহিদুল?
কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের আদমপুর ইউনিয়নের টুকারকান্দি গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান জাহিদুল। তার বাবা নজরুল ইসলাম ঢাকায় নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি করতেন। ২০২৩ সালে গবাদিপশু পালনের আশায় গ্রামে ফিরে আসেন। দুই লাখ টাকায় কেনা ষাঁড়টি অজ্ঞাত রোগে মারা গেলে সংসারে নেমে আসে বিপর্যয়। সাত মাসের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাবা।
বাবার মৃত্যুর পর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া জাহিদুলকে সংসারের হাল ধরতে হয়। কখনো কৃষিশ্রমিক, কখনো ওয়ার্কশপে কাজ করে সংসার চালাতেন। নবম শ্রেণিতে উঠে নিজে প্রাইভেট না পড়লেও অন্যদের পড়াতেন, সেই আয়েই চলত নিজের পড়াশোনা। দশম শ্রেণিতে স্কুলে নিয়মিত যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও বন্ধুদের কাছ থেকে বইয়ের ছবি তুলে এনে পড়তেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড
বাংলার ঘরে ঘরে যে শিক্ষার আলো জ্বালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই আলোই আজ জাহিদুলের মতো অগণিত তরুণ-তরুণীর চোখে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি আন্দোলনের মূলে ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির চেতনা। জাহিদুলের সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাঙালি জাতি যত বাধাই আসুক, জ্ঞান অর্জনের পথ থেকে পিছু হটে না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, “ছেলেটি নিয়মিত স্কুলে আসতে পারত না, কাজ করতে হতো। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সে। এই ফল তার নিজের চেষ্টা ও মেধার অর্জন।”
স্বাধীন দেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন কি সবার জন্য সমান?
এসএসসি পরীক্ষা শেষে আবার নতুন কাজে যোগ দিয়েছে জাহিদুল। মুন্সিগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত, দিনে ১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতন। বেতনের একটি অংশ যায় ঋণ পরিশোধে, এখনো ৬০ হাজার টাকা ঋণ বাকি।
জাহিদুল বলে, “আমার ইচ্ছা বুয়েটের যেকোনো বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। ভাবছি ১৪ ঘণ্টা কাজ করে কলেজের পড়াশোনা চালাব কী করে। আবার কাজ ছেড়ে দিলে পড়াশোনার খরচ জোগানোর তো উপায় নেই।”
জাহিদুলের মতো আরও তিন মেধাবী শিক্ষার্থী স্মরণিকা শিকদার, অষ্টমী রানী দাস ও সালমা আক্তারও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। প্রত্যেকের স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের, কিন্তু আর্থিক সংকট তাদের পথচলার প্রধান বাধা।
শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম কি রাষ্ট্রের বিবেককে জাগাবে?
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও যদি আমাদের মেধাবী সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অর্থের অভাবে ম্লান হয়ে যায়, তবে তা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের আদর্শে গড়ে ওঠা এই জাতি তার সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। জাহিদুলের মতো সংগ্রামী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র, সমাজ ও সুশীল সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
জাহিদুলের গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়, এটি বাঙালির অদম্য চেতনার প্রতীক। দারিদ্র্য, প্রতিকূলতা, ক্ষতি, সবকিছুকে পেছনে ফেলে জ্ঞান অর্জনের যে সংকল্প, তা-ই আমাদের জাতির প্রকৃত শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা গড়ে তুলব স্বনির্ভর, শিক্ষিত ও সোনার বাংলা, যে স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা।