অভাব-অনিশ্চয়তা পেরিয়ে জিপিএ-৫: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে চলা নতুন প্রজন্ম
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছিল সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার শিক্ষা। আজ সেই শিক্ষাই ধারণ করে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া চার শিক্ষার্থীর জীবনগল্প যেন সেই সংগ্রামী চেতনারই প্রতিচ্ছবি। অভাব, অনিশ্চয়তা, মা-বাবাকে হারানোর বেদনা, সবকিছু পেরিয়ে তারা আজ সাফল্যের শিখরে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার পথে তাদের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ, কলেজে পড়ার খরচের সংস্থান।
মা-বাবাকে হারিয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার ইটাউড়ি গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায়ের জীবনের গল্প শুনলে চোখে পানি চলে আসে। বাবা অভিজিৎ রায় লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে তিন বছর আগে মারা যান। তারও দুই বছর আগে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মা সন্ধ্যা রানী দাস। শিশু বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল স্বপ্ন। মা-বাবার চিকিৎসার জন্য পরিবারের সব সম্পদ বিক্রি করে দিতে হয়েছিল।
মা-বাবার মৃত্যুর পর স্বপ্নের পাশে দাঁড়ান তার কাকা অভিমুন্য রায়। পিতৃস্নেহে তাকে জড়িয়ে নিয়ে নিজ সন্তানের মতো লেখাপড়ার খরচ মেটানোসহ সবকিছুর দায়িত্ব নেন। মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে স্বপ্ন।
অভিমুন্য রায় বলেন, 'আমার ভাতিজা অত্যন্ত মেধাবী। পিতা-মাতাহারা ছেলেটি লেখাপড়া করে ডাক্তার হতে চায়। আমার পক্ষে লেখাপড়াসহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। কেউ সহায়তার হাত না বাড়ালে তার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে।'
স্বপ্ন রায় বলে, 'আমার কাকা আমার জন্য যা করেছেন, তা আমি জীবনেও পরিশোধ করতে পারব না। চোখের সামনে মা-বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় মরতে দেখেছি। আরও ভালো চিকিৎসা করাতে পারলে তারা হয়তো বেঁচে যেত। তাই আমি লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।'
বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বিজন কুমার তালুকদার বলেন, 'আমাদের বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায়। লেখাপড়া করার সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে সে দেশবাসীর মুখ উজ্জ্বল করবে।'
রিকশাচালক বাবার মেয়ে শাবনাজের সংগ্রাম
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি মহল্লার বস্তিতে ১০ বাই ১০ ফুটের একটি টিনের চালা ঘর। সাত সদস্যের পরিবারের মাথা গুঁজে থাকার ঠিকানা এই ঘরটিই। সেখানেই বেড়ে উঠেছে মোছা. শাবনাজ খাতুন রানি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
শাবনাজের বাবা মো. ইসমাইল সৈয়দপুর শহরে রিকশা চালান। ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হন, ফেরেন গভীর রাতে। দুই বছর আগে এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনেছেন। রিকশার কিস্তি পরিশোধ করে যা থাকে, তা দিয়েই সাতজনের সংসার চলে। মা মোছা. লাডলি আগে মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন, এখন অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না।
শাবনাজ বলে, অনেক রাত না খেয়েও কেটেছে তাদের। এখন উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে সে আরও বলে, 'জানি না, ভাগ্যে লেখাপড়া আছে কি না।'
মো. ইসমাইল বলেন, 'এখন আমার বয়স ৫৫ বছর। সারা দিন রিকশা টেনে শরীরে শক্তি পাই না। মৃত্যুর আগে মেয়েটাকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে চাই।'
আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, শাবনাজ অনেক মেধাবী। ওর লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তার একাগ্রতা। মা-বাবার কষ্টকে সে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।
দিনমজুর বাবার মেয়ে লিজার অদম্য ইচ্ছাশক্তি
শৈশব থেকেই মায়ের স্নেহ পায়নি লিজা আক্তার। বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন মা আমেনা বেগম মারা যান। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বাড়িগাঁও গ্রামে বাবার সঙ্গে বেড়ে ওঠা লিজার জীবনের পরতে পরতে ছিল অভাব আর চরম প্রতিকূলতা। কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। এবারের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
অন্যের জমিতে মজুরি খেটে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বাবা বিল্লাল হোসেন। চার লক্ষাধিক টাকা ঋণ করে ২০২৪ সালে লিজার বড় ভাই হৃদয় মিয়াকে বিদেশে পাঠায় পরিবার। তবে সেখানে গিয়ে ভালো কাজ পাননি হৃদয়। এতে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবার।
লিজা নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন দুটি টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করেছে। সে বলে, 'ভবিষ্যতে আমি একজন শিক্ষক হতে চাই, যাতে আমার মতো কষ্টে লেখাপড়া করা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আর কারও কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কষ্টে থাকা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে সহযোগিতা করতে চাই।'
বিল্লাল হোসেন বলেন, 'মাইয়াডার লেখাপড়া করার আগ্রহ অনেক, কিন্তু কলেজের বই-খাতা-পোশাক কিনার টাহা লইয়া চিন্তায় আছি।'
মাটির হাঁড়িপাতিল তৈরির পরিবারের সন্তান লক্ষ্মী
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের লক্ষ্মী রাণী পালের বাবা পরিতোষ পাল মাটির হাঁড়িপাতিল তৈরি করেন। মা শিখা রাণী পাল গৃহিণী। বাড়ির আঙিনায় মাটির পণ্য তৈরি করে সামান্য কিছু আয় হয়। এই অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়া লক্ষ্মী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আইন নিয়ে পড়ালেখা করে বিচারক হতে চায় সে।
পরিতোষ পাল জানান, মাত্র ৫ শতক জমির ওপর টিনের বাড়িতে তাঁরা বসবাস করেন। মাটির পাত্র তেমন বিক্রি হয় না। বছরে ছয় মাস মাটির পাত্র তৈরির কাজ চলে, অন্য সময় বসে থাকতে হয়। এই কাজ করে তাঁর মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকায় সংসার খরচের পাশাপাশি মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাতে হয়।
মা শিখা রাণী জানান, মেয়ে ছোট থেকেই পড়ালেখায় ভালো। অন্য বান্ধবীরা ভালো ভালো পোশাক পরে স্কুলে এসেছে, তাকে এক পোশাকে সপ্তাহ পার করতে হয়েছে। নিজে গাইড বই কিনতে পারেনি, অন্যের বাড়িতে গিয়ে খাতায় পড়া লিখে এনে পড়তে হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ জানান, লক্ষ্মী রাণী পাল খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় অনেক কষ্ট করে তাকে পড়ালেখা করতে হচ্ছে। একটু সহযোগিতা পেলে সে ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারবে।
সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সাফল্য, কিন্তু মুখে হাসি নেই
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের কোনো বিকল্প নেই। আজকের এই মেধাবী শিক্ষার্থীরাও যেন সেই আত্মত্যাগের পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? ১৯৭১-এ আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই স্বাধীনতার সুফল কি এই মেধাবী তরুণ-তরুণীদের কাছে পৌঁছাবে?
চারটি পরিবারের গল্পই যেন একই সুরে কথা বলে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সাফল্য পেলেও কলেজে পড়ার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাদের মুখে হাসি নেই। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই মেধাবীরা একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে এই তরুণ প্রজন্মই আমাদের মূল শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। কারণ, একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণ মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন পূরণ, একটি জাতির অগ্রযাত্রা।