৫৪ বছরের পুতুল জাদুঘর বন্ধ: কলকাতার নেহরু চিলড্রেন মিউজিয়ামের শেষ অধ্যায়
আসিফ রহমান | ২ অগস্ট ২০২৬
১৯৭২ সালের ১৪ নভেম্বর শিশু দিবসে কলকাতার চৌরঙ্গি রোডে যে পুতুল জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়েছিল, তা আজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হতে চলেছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক ধরে শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র ছিল নেহরু চিলড্রেন মিউজিয়াম। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে ৪০-৫০ লক্ষ টাকার অভাবে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পুতুল জাদুঘরের ইতিহাস: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বাংলার সংস্কৃতি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যুগল শ্রীমল নামে এক মুর্শিদাবাদের অভিজাত পরিবারের সন্তান ১৯৪৫ সালে ন্যাশনাল কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শিশুদের বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। ১৯১৯ সালের ৮ অক্টোবর জন্ম নেওয়া যুগল শ্রীমলের পুতুল সংগ্রহের নেশা তাকে এই অসাধারণ সংগ্রহশালা গড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
জাদুঘরটিতে এখন ৯২টি দেশের পুতুল রয়েছে। বিশেষ করে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি মাটির পুতুলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া গণেশ গ্যালারিতে ৩০০-র বেশি বিভিন্ন আকারের গণেশ মূর্তি রয়েছে। এই সংগ্রহশালা শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেন বন্ধ হচ্ছে এই ঐতিহাসিক জাদুঘর?
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, বছর তিনেক আগে দমকল তাদের অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখে সতর্ক করে। ছয়তলা সংগ্রহশালার আগুন নেভানোর পরিকাঠামো উন্নত করতে বলা হয়। কিন্তু স্প্রিংকলার বা জল ছেটানোর যন্ত্র বসাতে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা প্রয়োজন। সেই অর্থ না থাকায় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে জাদুঘর বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অঙ্কন বিভাগের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট পিয়ালি ঘোষ বলেন, ''আমরা তো আর ছোট ছেলে-মেয়েদের সুরক্ষার ব্যাপারে আপস করতে পারি না।'' তিনি আরও জানান, ২০১৭ সাল থেকে রাজ্য সরকারের আর্থিক অনুদান বন্ধ হয়ে গেছে। তার আগে বিভিন্ন সময়ে রাজ্য সরকার সাহায্য করলেও এখন তা আর পাওয়া যাচ্ছে না।
শিশুদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর প্রভাব
এই জাদুঘরটি শুধু পুতুলের সংগ্রহশালা নয়, বরং শিশুদের সৃজনশীলতার কেন্দ্র ছিল। জওহর শিশু ভবনে শিশুদের নৃত্য, ছবি আঁকা ও আবৃত্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। কোভিডের আগে ১,৫০০-২,০০০ শিশু এখানে শিখত। এখন প্রায় ৯০০ জনকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
জাদুঘরটি সমাজসেবামূলক কাজেও জড়িত ছিল। বছরে দু'বার বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের আর্থিক সাহায্য করত তারা। উদ্বোধনের পর থেকে ১০ কোটির বেশি দর্শক এই জাদুঘরে পা রেখেছেন। এক কোটির বেশি আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিশুরা উপকৃত হয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী? রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আবেদন
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল এবং পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষকে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি বন্ধ হওয়া শুধু কলকাতার নয়, বরং সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য একটি বড় ক্ষতি। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য আমাদের নিজেদেরই সচেতন হতে হবে। বিদেশি প্রভাব ও রাজনৈতিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
নেহরু চিলড্রেন মিউজিয়াম কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯৭২ সালের ১৪ নভেম্বর শিশু দিবসে এই জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়।
জাদুঘর বন্ধের মূল কারণ কী?
অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে ৪০-৫০ লক্ষ টাকার অভাবে জাদুঘর বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাদুঘরটিতে কতটি দেশের পুতুল রয়েছে?
জাদুঘরটিতে ৯২টি দেশের পুতুল সংগ্রহ করা আছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ কার কাছে সাহায্য চেয়েছে?
তারা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী এবং পর্যটনমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন।