অপরাহ্নের গল্প: তেলিয়াপাড়ার পথে এক মুক্তিযোদ্ধার চোখে দেখা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে তেলিয়াপাড়া। ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত পথের এই জনপদ আজও তার ইতিহাসের গন্ধ ধরে রেখেছে। এক বিকেলে বাস ভেঙে পড়ায় তেলিয়াপাড়া বাজারে থামতে হয়েছিল। সেখানেই দেখা মিলল এক তরুণী ও তার মেয়ের সঙ্গে। এই অপরাহ্নের গল্প শুধু একটি সাধারণ সাক্ষাৎ নয়, বরং আমাদের জাতীয় পরিচয়ের এক টুকরো প্রতিচ্ছবি।
বাসটা ভালোই চলছিল, কিন্তু জগতে অবিমিশ্র ভালো বলে কিছু নেই। দুপুর যখন বাসের চাকার সঙ্গে গড়িয়ে যাচ্ছে বিকেলের দিকে, বাসটা ঝাঁকি দিয়ে দুএকবার কাশল -- জটিল কাশির রোগীর মতো-থেমে থেমে কিছুটা এগুলো, তারপর নিথর হয়ে গেল। রাস্তাটা মাঝারি সাইজের, কিন্তু বাস ট্রাক চলে বুনো মোষের মতো তেজে। প্রতিমুহূর্তে একটা 'গেল, গেল' ভাব। আমাদের চালক একটু বেশি সতর্ক, নাকি বাসের স্বাস্থ্যটা উপদ্রুত, জানি না, কিন্তু যাত্রাটা তেমন ভীতিকর মনে হয়নি। তবুও, থামায় একটু স্বস্তি পেলাম, কিছুক্ষণের আয়ু ফিরে পাওয়ার স্বস্তি। কিন্তু সেটি বেশিক্ষণ থাকল না। কারণ বাসটা ঠেলতে হবে।
ঠেলতে হবে? হ্যাঁ ঠেলতে হবে। সবাই হাত লাগান ভাই, আমাদের কিছু করার নাই। তেলিয়াপাড়া ওই দেখা যায়। ওখানে পৌঁছানো গেলে বাসটা সারানোর একটা ব্যবস্থা হবে।
তেলিয়াপাড়ার ইতিহাস ও বর্তমান
তেলিয়াপাড়া কোনো বিখ্যাত জায়গা নয়। এর নামের সঙ্গে কোনো ইতিহাস কিংবা কিংবদন্তির গন্ধ নেই। আশেপাশে প্রচুর জঙ্গল, জগতে যা ক্রমশ বিরল হচ্ছে বলে আমরা জানি। আর আছে চা বাগান। আরো নিশ্চয় অনেক কিছু আছে। কিন্তু সেসবের খবর তেলিয়াপাড়াবাসীরাই বলতে পারবেন। আমি তেলিয়াপাড়াবাসী নই। বাইরে থেকে যতটা চোখে পড়ে, তাই বর্ণনা করতে পারি। কিন্তু বর্ণনাটা বরং একটু পরেই করি, কারণ আপাতত আমার চোখে একটা মুগ্ধতা ধরা পড়েছে। না, তেলিয়াপাড়ার প্রকৃতির সৌন্দর্য-মুগ্ধতা নয় -- তেলিয়াপাড়া বাজারে, যেখানে আমরা বাসটাকে ঠেলতে নিয়ে এসেছি, তেলিয়াপাড়ার এই ডাউনটাউনে, বস্তুত কোনো প্রকৃতি নেই। এখানে এসে পৌঁছানোর আগেই প্রকৃতি সাবাড় হয়ে গেছে। প্রকৃতি যেটুকু আছে, তা মানুষকে ঝোঁপঝাড়ের দিকে টানার জন্য।
এক তরুণীর চোখে স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি
আমার মুগ্ধতার বিষয় এক তরুণী, আটাশ ত্রিশের মতো বয়স। সুশ্রী। সুশ্রী তরুণীদের চোখ নাক মুখ এবং শরীরের গড়ন এবং চুল সবই সুন্দর হয়। এই তরুণীরও। তদুপরি তার সবুজ রঙের তাঁতের শাড়িটিও সুন্দর -- নাকি তার গায়ে লেগে শাড়িটা সুন্দর হয়েছে, কে জানে। তরুণীর সঙ্গে একটি ৫/৬ বছরের মেয়ে, নিশ্চয় তার। কিন্তু আশেপাশের স্বামী-সদৃশ কাউকে দেখা গেল না। হয় সে মানুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছে, অথবা মেয়ের জন্য বিস্কুট অথবা কেক কিনছে, অথবা সে সঙ্গে আসেনি। অথবা সে মৃত।
তরুণীটির ফর্সা মুখ কিছুটা লাল হয়ে আছে, যদিও তাকে (অবশ্যই) গাড়ি ঠেলতে হয়নি। তার কপালে ঘামের চিহ্ন। দিনটাকে অবশ্য উষ্ণই বলা যায়. যদিও শীত আসার খবর রটে যাওয়ার কথা বাতাসে। সূর্য হেলে পড়তে শুরু করেছে। বাসটা যেখানে থামিয়ে মেকানিকের খোঁজে গেছে ড্রাইভার, তার পাশে কিছু কাঁচামালের দোকান। আড়ত। গদিতে মোটাসোটা দোকানি বসে হিসাব করছে, নয়তো আলাপ করছে কারো সাথে। একটা দোকানের সামনে বাঁশের বেঞ্চ পাতা। সেই বেঞ্চে মেয়েকে নিয়ে বসেছে তরুণীটি। ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে, যদিও বাতাসে ক্লান্তির কোনো স্পর্শ নেই। সতেজ, স্বাস্থ্যময় বাতাস। প্রাণটা জুড়িয়ে দেয়। অন্তত আমার দিয়েছে।
একটি সাক্ষাৎ ও ভাষার বন্ধন
আমি বেঞ্চটার বিপরীতে একটা পাথরের উপর বসি। তিনটে বড়সড় পাথর ফেলা মেটে রাস্তার একপাশে, অন্য পাশে পরপর তিনটে দোকান। কী সুন্দর হিসাব! আমার ও তরুণীর মাঝখানে ছ'সাত ফুটের ব্যবধান। বাসের প্যাসেঞ্জাররা হল্লা করছে এদিক-সেদিক। কেউ চা খাচ্ছে, উচ্চস্বরে কথা বলছে। কেউ উদ্দেশ্যহীন হাঁটছে। অনেকেই দেখছে তরুণীটিকে। আরো মহিলা যাত্রী আছে, তাদের দুএকজনকেও মানুষ দেখছে, যারা একটু দেখার মতো তাদেরকে। তবে বেশি দেখছে এই তরুণীটিকে।
বাসে উঠে ভালো সিট দখলের প্রতিযোগিতায় কোনোদিকে তাকানোর সময় হয়নি। তরুণীটিকে দেখিনি। তার কন্যাটিকেও। এখন তার দিকে চোখ পড়তে একটা আবিষ্কারের আনন্দ পাচ্ছি। তরুণীটি চুপচাপ বসে। আমিও। আমাদের মাঝখানের মেটে রাস্তাটাতে কোনো উত্তেজনা নেই। শুধু খড়খড় বাতাসে দুএকটা পাতা আর ধুলিকণা ওড়াওড়ি করে।
তরুণীটি ক্লান্ত চোখে আমার দিকে তাকায়। সাধারণ, অবিশেষ দৃষ্টিপাত। তবে আমি জানি, আমি তার চোখে পড়ব অচিরেই। দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দৃষ্টিপাতে। শুধু সময়ের ব্যাপার। কেন তার চোখে পড়ব আমি? কারণ, আমাকে সেখানে দেখলে আপনারও চোখে পড়ত। তেলিয়াপাড়ার ডাউনটাউনে এই নিঃসঙ্কোচ অপরাহ্নে চোখে পড়ার মতো আর কেউ ছিল না ধারে কাছে। আমার গায়ে একটা লাল চেক শার্ট চোখে সোনার রিমের চশমা। আমার পরনে জিনসের প্যান্ট: যেখানে অন্যান্য প্যাসেঞ্জারের অনেকেই পরেছে লুঙ্গি না হয় সস্তা কাপড়ের প্যান্ট। আমার চেহারাতেও একটা কুলীন কুলীন ভাব। বস্তুত অনেকেই আমার দিকে দুএকবার সম্ভ্রমের চোখে দেখেছে, অকারণে সালামও দিয়েছে দু'এক যুবক। সালামযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারীই বলা যায় আমাকে, সে কারণে বাস ঠেলা থেকেও হয়তো অব্যাহতি পেয়েছি।
দ্বিতীয়বার আমার দিকে চোখ পড়তেই একটু থমকে তাকাল তরুণীটি। মনে হলো, আমাকে যেন খুঁটিয়ে দেখল, দু'দণ্ড। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিল। আমি নিশ্চিত হই, রাস্তায় ঘুরঘুর করতে থাকা উদভ্রান্ত কুকুরটি বাসটির ছায়া মাড়িয়ে চলে যাওয়ার আগেই তৃতীয় নেত্রপাত ঘটবে। এবং তাই ঘটল।
আমি এবার সরাসরি তরুণীটির দিকে তাকালাম। একটুখানি বিচলিত মনে হলো তাকে। কিন্তু মুহূর্তমাত্র। তারপর মৃদু হাসল। হাসিটি বিপন্ন, যদিও মাধুর্যের কোনো কমতি নেই তাতে। 'আপনার মেয়ে বুঝি?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।
'জ্বি, আমার মেয়ে, মিথিলা'। সে বলল, 'মিথিলা, সালাম করো।' সালামযোগ্য ব্যক্তিত্বই বটে।
'সুন্দর নাম, সচরাচর শোনা যায় না।'
'ধন্যবাদ,' বলল তরুণীটি, দেখা যাচ্ছে, সুশ্রী তরুণীটির শিক্ষা এবং রুচি আছে। কিন্তু স্বামীটি কোথায়? মনের মধ্যে প্রশ্নটা জাগে, কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না, অথবা এরকম প্রশ্ন করার যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি না।
'দূরে কোথাও যাচ্ছেন?' আমি সভ্য মানুষের মতো প্রশ্ন করি। 'যত দূর গাড়িটা যাবে', তরুণীটি হেসে বলে, 'অর্থাত্ শ্রীমঙ্গল। আপনি?'
'আমিও।'
'ও।'
তরুণীটি দূরের গাছপালার সারির দিকে চোখ ফেরায়। তার শাড়ির আঁচল বাতাসে ওড়ে। আঁচলটা ধরে সে কপালের ঘাম মোছে। মেয়ের মাথায় হাত ঠুকে আদর করে। আমি বুঝতে পারি, তার চোখ এবং মনোযোগ আবার আমার দিকে ফিরবে -- যদিও এক অর্থে তাদের সরিয়ে নেয়নি সে। কথোপকথনে সাময়িক ছেদ পড়েছে -- শুধু অভ্যাসের জন্য। মনে মনে হয়তো ভাবছে, আর কিছু বলা সঙ্গত কিনা, অথবা কতক্ষণ আর কথা বলা শোভন হবে। কথা বলতে আগ্রহ না থাকলে তরুণীটি 'একটু হেঁটে আসি, বসে বসে ভাল্লাগছে না বলে উঠে যেত। কিন্তু সে বসে আছে। আমি তাকে দেখছি; কারণ দেখতে ভালো লাগছে। গাড়িটা বিকল হয়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে থাকুক সেটি বিকল হয়ে। আর আমি মেয়েটির সামনে এই পাথরে বসে থাকি একটা দিন।
তরুণীটি আবার দৃষ্টি ফেরায়। মৃদু হাসে। 'শ্রীমঙ্গলেই থাকেন?' সে জিজ্ঞেস করে।
'না, ঢাকাতে।'
'কাজে যাচ্ছেন?'
'কাজেও বলতে পারেন, অকাজেও বলতে পারেন।'
তরুণীটি কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে।
'লেখালেখির জন্য একটা বাগানে যাচ্ছি।'
'কী লেখেন?'
'এই টুকিটাকি, গল্প উপন্যাস -- এইসব।' আমি বিষয়টা হালকা করার জন্য বলি।
'একা যাচ্ছেন যে?'
'একা মানুষ। একাই তো যেতে হয়।'
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, 'লেখালেখিতে চলে? প্রশ্নটা শুনে মন খারাপ হয়ে যায়। লেখালেখি যারা করে, তাদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে মানুষ দেখবে, এরকম ভাবতে আমার ভালো লাগে। এর সঙ্গে আবার জীবিকার প্রশ্নটা কেন জড়িয়ে ফেলা? প্রসঙ্গটা এড়াতে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, 'শ্রীমঙ্গলেই থাকেন?'
মেয়েটি মাথা নাড়ে।
'নিজের বাসা?'
আবারো সে মাথা নাড়ে।
মেটে রাস্তাটা যেখানে চওড়া হয়ে একটা তেলের কলের সামনে গিয়ে ডানে বাঁক নিয়েছে, সেখানে কিছু ছোট ছেলেমেয়ে খেলছে। হৈ চৈ করছে। এদের কেউ বাজারে মুটের কাজ করে, কেউ এমনিতেই ঘুরে বেড়ায়। এদের সঙ্গে যাত্রীদের দু'এক সন্তান যোগ দিয়েছে। মায়ের পাশে বসে এতোক্ষণে অধৈর্য হয়ে পড়েছে মিথিলা। এবার সে উঠে দাঁড়ায়, মায়ের হাত ধরে টানে। সেও খেলবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি
এই অপরাহ্নের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অস্তিত্বের লড়াই। ১৯৭১ সালে তেলিয়াপাড়ার মতো ছোট ছোট জনপদ থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আজকের এই তরুণী ও তার মেয়ের মতোই আমাদের পূর্বপুরুষরা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি স্বাধীন দেশের। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব, কিন্তু তার সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।
বাংলা ভাষা আমাদের পরিচয়, আমাদের অহংকার। এই ভাষার মাধ্যমেই আমরা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার গল্প বলি। তেলিয়াপাড়ার এই অপরাহ্নের গল্পটি শুধু একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় চেতনার এক টুকরো প্রতিফলন।
FAQ
তেলিয়াপাড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
তেলিয়াপাড়া বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বহন করে।
এই গল্পটি কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার সাথে সম্পর্কিত?
গল্পটি তেলিয়াপাড়ার পটভূমিতে লেখা, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি কৌশলগত স্থান ছিল। এটি আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের স্মৃতি তুলে ধরে।
বাংলা ভাষা কেন এই গল্পে গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলা ভাষা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের মূল। এই গল্পে ভাষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংযোগ ও আবেগ প্রকাশিত হয়েছে, যা আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।