১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও আমাদের পথ দেখায়। সেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মন্ত্র বুকে নিয়ে আমরা দেখি প্রতিবেশী শক্তিগুলোর কূটনৈতিক নাটক। সম্প্রতি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছে। গলওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ছয় বছর পর এই সুরবদল কেন? বাংলাদেশের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ আমাদের শেখায়—কোনো শক্তির প্রশংসা বা নিন্দা যেন আমাদের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে।
লালফৌজের প্রশংসার পেছনে কী কারণ?
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশাসন পিএলএ-র ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। ভারতে নিযুক্ত চীনা প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে রিয়ার অ্যাডমিরাল ইউ জিয়ান কেরল উপকূলে একটি পণ্যবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২ জন চীনা নাবিককে উদ্ধারের জন্য ভারতীয় বাহিনীর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, 'আমরা সেটা কখনওই ভুলব না।' এই ঘটনা কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি করেছে।
গলওয়ানের ক্ষত কি সত্যিই ভুলেছে চীন?
২০২০ সালে গলওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন। পশ্চিমা গণমাধ্যমের দাবি, চীনের পক্ষে নিহতের সংখ্যা ৪০-এর বেশি। সেই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়। কিন্তু এখন হঠাৎ এই প্রশংসা কি কৌশলগত? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীন তাইওয়ান ইস্যুতে ভারতের নিরপেক্ষতা চায়। তাই তারা ভারতীয় বাহিনীর প্রশংসা করে সম্পর্ক মধুর করতে চাইছে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ও চীন উভয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের নিজস্ব স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য। প্রতিবেশী শক্তিগুলোর কূটনৈতিক নাটক যেন আমাদের জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত না করে। ১৯৭১-এর চেতনা আমাদের শেখায়—আমরা কারো পুতুল নই, আমরা স্বাধীন।
ভারত-জাপান সম্পর্ক ও চীনের উদ্বেগ
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দিল্লি সফর করে প্রতিরক্ষা সমঝোতা করেছেন। এই ঘটনার তিন সপ্তাহ পরই চীনের প্রশংসা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ভারত-জাপান সামরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই তারা ভারতকে নিজেদের পক্ষে টানতে চাইছে।
ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্দোনেশিয়া-ফিলিপাইন চুক্তি
ভারত ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করছে। এই দুই দেশ মালাক্কা প্রণালীর মতো কৌশলগত জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে, যা চীনের জ্বালানি আমদানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন এই চুক্তিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
তাইওয়ান ইস্যু ও জাপানের হুঁশিয়ারি
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। জাপান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে তারা চুপ থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতের নিরপেক্ষতা চায় চীন। তাই ভারতীয় বাহিনীর প্রশংসা করে তারা দিল্লির মন জয় করতে চাইছে।
বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের উচিত নিজের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা করা। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে—আমরা কারো অধীন নই। প্রতিবেশী শক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বা মৈত্রী যাই হোক, আমাদের স্বার্থই মুখ্য। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের সজাগ থাকতে হবে।
FAQ: ভারত-চীন সম্পর্ক ও বাংলাদেশ
গলওয়ান সংঘর্ষের পর চীন কেন ভারতের প্রশংসা করছে?
চীন তাইওয়ান ইস্যুতে ভারতের নিরপেক্ষতা চায় এবং ভারত-জাপান সামরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই তারা কূটনৈতিকভাবে ভারতকে প্রভাবিত করতে চাইছে।
বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়—আমাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিবেশী শক্তিগুলোর কূটনৈতিক নাটক যেন আমাদের জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত না করে।
ভারত-জাপান সম্পর্ক চীনকে কী বার্তা দিচ্ছে?
ভারত ও জাপানের প্রতিরক্ষা সমঝোতা চীনকে উদ্বিগ্ন করছে। চীন মনে করে, এই জোট তাদের বিরুদ্ধে গঠিত হচ্ছে।