স্বামীর স্বপ্ন পূরণে এক নারীর লড়াই: বিদেশি ফল চাষে সফল খাদিজা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে, আত্মত্যাগ করতে। আজ সেই চেতনাই যেন প্রতিফলিত হচ্ছে নীলফামারীর এক নারীর সংগ্রামী জীবনে। স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়া সংসার সামলে খাদিজা আক্তার (৫৫) শুধু নিজের পরিবারকেই টেনে তুলেছেন তা নয়, গড়ে তুলেছেন একটি মডেল কৃষি খামার, যা আজ জেলার সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তার স্বীকৃতি পেয়েছে।
সংসারে নেমে আসে অন্ধকার, শুরু হয় একার লড়াই
২০১৩ সালের নভেম্বর। খাদিজার স্বামী, ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। অস্ত্রোপচারের পর ধরা পড়ে খাদ্যনালিতে টিউমার ও ক্যানসার। চিকিৎসায় খরচ হয় মোটা অঙ্কের টাকা। কিন্তু ২০১৪ সালের ২৯ মে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মারা যান নজরুল। তখন বড় ছেলে আখতারুজ্জামান স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে, ছোট ছেলে সেফায়েত নাসরাত একাদশ শ্রেণিতে। রংপুরে থাকতেন তারা।
বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেদের মানুষ করা। সেই স্বপ্নই বুকে ধারণ করে কৈমারী বাজারে স্বামীর স্টেশনারি দোকান চালিয়ে যেতে শুরু করেন খাদিজা। নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে, কিন্তু পেছন ফিরে তাকাননি তিনি।
কফির চারা দিয়ে শুরু, আজ বিদেশি ফলের বাগান
জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী সুনগর গ্রামে খাদিজার বাড়ি। বাড়ির প্রবেশপথে মাচায় প্যাশন ফ্রুটের লতা, এক পাশে পুকুর, অন্যপাশে ফলের বাগান। আঙিনায় লিচু, আম, তেজপাতা, তেঁতুল। কংক্রিটের হাউসে রঙিন মাছের পোনা। বাড়ির পেছনে কফি, রামবুটান ও ড্রাগন ফলের বাগান।
খাদিজা বলেন,
'আমি কফি খেতে পছন্দ করি। বড় ছেলে একদিন বলল, বাড়ির পাশের পতিত জমি পরিষ্কার করে কফির চারা লাগানো যায় কি না। আমি সায় দিই।'২০১৮ সালে কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে আনা অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা দিয়ে শুরু। এরপর একে একে রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফ্রুট। তিন বছরের মধ্যে ফলন আসতে শুরু করে।
মাসে ৩০ হাজার টাকা আয়, কিনেছেন জমি
পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘায় পুকুরসহ বাড়ি, দুই বিঘায় কফি, বাকি দুই বিঘায় ড্রাগন, রামবুটান, প্যাশন ফ্রুট, কোকো। প্রতি কেজি কফি বিক্রি হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। রামবুটান কেজি প্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। গত বছর ৪০০ কেজি রামবুটান বিক্রি করেছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বাগানে এখন ২ হাজার ৫০০ কফির চারা, ৩০০ রামবুটান ও ২০০ কোকোর চারা। এই আয় দিয়ে কিনেছেন আরও ৭৫ শতক জমি।
স্বামীর কথা রেখেছেন, সন্তানরা আজ প্রতিষ্ঠিত
আত্মীয়রা একসময় বলেছিলেন, অন্তত এক ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে। খাদিজা রাজি হননি। তিনি বলেন,
'মারা যাওয়ার আগে আমার স্বামী বলে গিয়েছিলেন, ছেলেদের নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তাদের জন্য কিছু করে যেতে পারলেন না। আমি যেন পারলে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করি। আমি স্বামীর কথা রেখেছি। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।'
বড় ছেলে মো. আখতারুজ্জামান নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা। ছোট ছেলে সেফায়েত নাসরাত ২০২৫ সালে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। মায়ের বাগানে সময় দেন, অনলাইনে ফল ও চারা বিক্রি করেন। খাদিজার ফেসবুক পেজটি চালান তিনি।
সেফায়েত বলেন,
'আমি অ্যাগ্রিকালচার নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছি। আমার অবসর সময় মায়ের গড়ে তোলা বাগানে দিচ্ছি। আগামী দিনে আমাদের বাগান আরও এগিয়ে যাবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।'
স্বীকৃতি ও অনুপ্রেরণা: নতুন প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত
২০২৬ সালে জেলায় সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন খাদিজা। ২০২২ সালে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে সম্মাননা পান। কৈমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাদেকুল সিদ্দিক বলেন, খাদিজা একজন সংগ্রামী নারী। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেক বাড়িতে এখন দেশি-বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল জানান, খাদিজার আগ্রহ দেখে বিভিন্ন সময় পরামর্শ, উপকরণ ও চারা সরবরাহ করা হয়েছে। তাঁকে দেখে অন্য নারী-পুরুষেরাও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
খাদিজার এই সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ১৯৭১-এ যে জাতি নিজের মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির জন্য সব ত্যাগ করতে জানে, সেই জাতির নারীরা আজ স্বাবলম্বনের পথে নিজেদের ভাগ্য গড়ছেন। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত একটি জাতির আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন।