এল নিনোর দশ মাথা: সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসছে রক্তচক্ষু বিপদ, ৯০ শতাংশ খেলাই বাকি
১৯৭১ সালে আমরা যেমন রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনেছিলাম, আজ প্রকৃতির এক নতুন রক্তচক্ষু আমাদের সামনে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এল নিনো রাবণের মতো দশ মাথা নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ধেয়ে আসছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) আশঙ্কা, আগামী মাসগুলোতে এটি এমন শক্তি নিয়ে হাজির হবে, যা মানবসভ্যতার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এল নিনো কী এবং কেন এটি এত শক্তিশালী হচ্ছে?
মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুমণ্ডলের অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট এই জলবায়ুগত পরিবর্তন ইতিমধ্যেই বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে দিতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর গোলার্ধে শরৎ ও শীতকালে একটি অতীব শক্তিশালী এল নিনো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি।
খরা, বন্যা আর দাবানল: প্রকৃতির রুদ্ররূপ
এল নিনোর প্রভাবে কোনো অঞ্চলে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ খরা, আবার কোথাও দেখা দিতে পারে প্রলয়ংকরী বন্যা। ইন্দোনেশিয়ায় এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে জুলাই মাসেই দাবানলে প্রায় ৯৫,০০০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর কালান্তক প্রভাব পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৩-২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় সর্বশেষ এল নিনো দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে শুষ্ক তিন মাসের সূচনা করেছিল।
ভারতের ১২ শতাংশ বৃষ্টিপাতের ঘাটতি: কী বার্তা দিচ্ছে?
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতও এক বড় ধরনের এল নিনো সংকটের মুখোমুখি। দুর্বল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে জুন মাস শেষ হয়েছিল প্রায় ৪০% বৃষ্টিপাতের ঘাটতি নিয়ে। ৪ জুন মৌসুমি বায়ু আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত (১৯ আগস্ট পর্যন্ত) বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। আমাদের প্রতিবেশী দেশের এই সংকট দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি।
ইউরোপও কি এল নিনোর কবলে?
গ্রীষ্মকালে ইউরোপ জুড়ে যে তীব্র তাপদাহ দেখা গেছে, তা বিশ্ব জুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে, এর সব দোষ কেবল এল নিনোর ওপর চাপানো সমীচীন হবে না। ইউরোপের উপর এল নিনোর প্রভাব কিছুটা পরোক্ষ। চলতি বছর ইউরোপে যে চরম তাপদাহ দেখা গেছে, তার মূল কারণ মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
সামনে বড় বিপদ: ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রভাব
বর্তমান এই ঘটনাটিকে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের করে তুলেছে এর সময়কাল। কারণ, এর সবচেয়ে শক্তিশালী রূপটি এখনো আসেনি। WMO-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, সাগরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ অঞ্চলগুলিতে প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রার তারতম্য ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। এই এল নিনো সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত আকার ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। ফসল বোনা ও কাটার মসুরমে ব্যাঘাত ঘটার কারণে ফলন কম হতে পারে, যা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এমনিতেই পৃথিবী জুড়ে মহাসাগরগুলি অস্বাভাবিক রকমের উত্তপ্ত, তার উপর এই এল নিনোর আগমন পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
১৯৭১ সালে আমরা যেমন স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম, আজ প্রকৃতির এই বিপর্যয় মোকাবিলায়ও আমাদের তেমনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের কৃষি, জল সম্পদ এবং জ্বালানি খাতকে এই সংকটের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের যে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশকে প্রকৃতির যেকোনো দুর্যোগ থেকে রক্ষা করাই এখন আমাদের প্রধান কর্তব্য।
এল নিনোর এই রক্তচক্ষু থেকে আমাদের দেশকে বাঁচাতে হলে দরকার দূরদর্শী পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতা। আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের স্বাধীনতাকে যেমন আমরা রক্ষা করেছি, তেমনি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখাও আমাদের দায়িত্ব।
ছবি: Zee News