কলকাতার অগ্নিকাণ্ড: দুই দশকে ২০০ প্রাণহানি, বারবার একই গাফিলতি
দুই দশকে কলকাতা শহর অন্তত নয়টি বড় অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। প্রতিটি ঘটনার পরেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে, তদন্ত কমিটি গঠন করে, কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার একই চিত্র। এই পুনরাবৃত্তিমূলক দুর্ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি গভীর সাংগঠনিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে মঙ্গলবার রাতের অগ্নিকাণ্ড আবারও তুলে এনেছে অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি। ২০০৬ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, প্রতিটি ঘটনায় একই ছবি: ঘরের ভিতরে ধোঁয়া, বাইরে আগুন, তালাবদ্ধ ফায়ার এগজিট, আর হতাহতের মিছিল।
দুই দশকের অগ্নিকাণ্ডের কালপঞ্জি
২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর তপসিয়ার চামড়া কারখানায় আগুনে ৯ জনের মৃত্যু হয়। কারখানার একমাত্র দরজার চাবি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্টে ৪৩ জন পুড়ে মারা যান, অনেকে বদ্ধ সিঁড়িতে আটকে। ২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে ৯৩ জন প্রাণ হারান, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন আইসিইউ ও গুরুতর অসুস্থ রোগী।
২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শিয়ালদহের সূর্য সেন স্ট্রিটের কাগজ-প্লাস্টিকের বাজারে ঘুমন্ত শ্রমিকদের ২০ জনের মৃত্যু হয়। ২০২১ সালের ৯ মার্চ স্ট্র্যান্ড রোডের পূর্ব রেলের নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিংয়ে আগুনে নয়জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন দমকল ও পুলিশের কর্মীও। ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল মেছুয়াবাজারের হোটেলে দুই শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকার মোমো কারখানার গুদামে আগুনে ২৭ জন নিখোঁজ হন, যাদের মধ্যে ১৮টি দেহাংশ শনাক্ত করা হয়। আর সবশেষে ১৯ অগস্ট নিউ মার্কেটের হোটেলের অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে শহরের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: ঘটনার পরেই সক্রিয়তা
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পরেই প্রশাসন ও পুলিশ নড়েচড়ে বসে। তদন্ত কমিটি গঠন, নির্দেশিকা জারি, গ্রেফতারি, সবই হয়। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এই চক্রটি দুই দশক ধরে চলছে, সরকার যাই থাকুক না কেন।
নিউ মার্কেটের ঘটনার পর দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মন্তব্য, ''পূর্বতন সরকারের অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে।'' একই সুরে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, গাফিলতির অভিযোগে দোষীরা ছাড় পাবেন না।
অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্যায়ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার পুরনো ভবনগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। অনেক হোটেল ও গেস্ট হাউসে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাই নেই। ফায়ার এগজিট তালাবন্ধ থাকে, জরুরি প্রস্থান পথ চিহ্নিত নয়, আর অগ্নি প্রতিরোধী উপকরণের ব্যবহার নগণ্য।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, কলকাতার জতুগৃহের ছবি আদৌ পাল্টাবে কি না। শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু তদন্ত কমিটি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োগ।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ড থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, জীবন ও স্বাধীনতার মূল্য সবচেয়ে বেশি। পাশের রাজ্যের এই দুর্ঘটনাগুলি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কি একই ধরনের ঝুঁকি নেই? ঢাকার পুরনো ভবন, মার্কেট, হাসপাতালগুলিতে কি অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট?
আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকদের জীবন সুরক্ষাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ১৯৭১ সালে আমরা যে মূল্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই মূল্যবোধ থেকেই আমাদের নিজেদের শহরগুলোকে নিরাপদ করতে হবে।
প্রশ্ন: অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রথমে প্রয়োজন কঠোর বিল্ডিং কোড ও তার প্রয়োগ। পুরনো ভবনগুলির নিয়মিত অডিট, অগ্নি প্রতিরোধী উপকরণ ব্যবহারে বাধ্যতামূলক নিয়ম, এবং দমকল বিভাগের আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে অগ্নি নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতার বারবার অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমাদের নিজেদের শহরগুলোকে নিরাপদ করতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।