নার্স রূপালীর রহস্যমৃত্যু: স্বাধীনতার ৫৪ বছরে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নে আবার চ্যালেঞ্জের মুখে সমাজ
কলকাতার নীলরতন সরকার (এনআরএস) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নাইট ডিউটির সময় এক নার্সের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে রহস্য দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। মৃত নার্সের নাম রূপালী দাস, বয়স ৩০। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর-২ ব্লকের আড়গোয়াল গ্রামের বাসিন্দা তিনি। বুধবার রাতে হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউ (HDU) ইউনিটে ডিউটির সময় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মাত্র এক বছর আগে বিয়ে হওয়া এই তরুণীর মৃত্যুতে পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত খুন?
ঘটনার বিবরণ: ডিউটির সময় নিখোঁজ, শৌচাগারে মৃতদেহ
বুধবার রাত ৮টা থেকে এনআরএস হাসপাতালের এইচডিইউ-তে নাইট ডিউটি শুরু হয় রূপালী দেবীর। কিন্তু ডিউটিতে যোগ দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তাকে আর ডিউটি রুমে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘক্ষণ সাড়াশব্দ না পেয়ে এবং শৌচাগারের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে সন্দেহ হয় সহকর্মীদের। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
মাত্র দুই বছর আগে এই হাসপাতাল থেকেই নার্সিং পাস করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন রূপালী। সামাজিক মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে তার সঙ্গে এক বেসরকারি সংস্থার অ্যাকাউন্ট্যান্টের প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এক বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। বর্তমানে দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় স্বামীর সঙ্গে থাকতেন তিনি।
রহস্যজনক ফোন: 'সুইসাইড করেছে' বলে তড়িঘড়ি ফোন কেটে দেন স্বামী
ঘটনার পর মৃতার বাবার বাড়ির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তার স্বামী। পরিবারের সদস্যরা জানান, হঠাৎই স্বামী ফোন করে সংক্ষেপে বলেন, 'আপনাদের মেয়ে সুইসাইড করেছে, পুলিস কেস হয়ে গেছে, আপনারা আসুন।' কথাটি বলেই তিনি তড়িঘড়ি ফোন কেটে দেন। স্বাভাবিকভাবেই হঠাৎ এমন দুঃসংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
মৃতার স্বজনেরা জানান, তাঁরা এখনই কারও বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও অভিযোগ আঙুল তুলে করছেন না। তবে তাঁদের পরিষ্কার দাবি: এটি যদি সাধারণ আত্মহত্যা না হয়ে কোনও খুন হয়, কিংবা মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের কারণে রূপালীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করা হয়ে থাকে, তবে তার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র: বাঁ হাতে ইনজেকশনের ক্ষত ও ওষুধের ভায়াল
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র উঠে এসেছে। দেহের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া জিনিসের মধ্যে ২ মিলিলিটারের (2 ml) একটি ভায়াল ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এছাড়া আরও দুটি ভায়াল অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে তীব্র যন্ত্রণা (extreme pain) উপশমের চিকিৎসায় সাধারণত এই ধরনের উচ্চমাত্রার ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
মৃতার বাঁ হাতে একটি ইনজেকশনের গভীর দাগ পাওয়া গেছে। ফলে তিনি নিজে বা অন্য কেউ সেই ওষুধ শরীরে পুশ করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার নিরপেক্ষতা সুনিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের সময় পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি রাখা হচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটির ভিডিওগ্রাফি করা হচ্ছে।
পুলিশের তদন্ত: সিসিটিভি ফুটেজ, কল লিস্ট ও সাক্ষীদের বয়ান
লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ ও এন্টালি থানার পুলিশ সমন্বয় রেখে ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে। হাসপাতালের সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি মৃতার মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) পরীক্ষা করা হচ্ছে। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, ডিউটি চিকিৎসক ও সহকর্মী নার্সদের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে।
তরুণীর দাম্পত্য বা ব্যক্তিগত জীবনে কোনও মানসিক অশান্তি বা সমস্যা ছিল কি না, তা জানতে তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলছেন তদন্তকারীরা। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের পরেই এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পরিষ্কার হবে বলে মনে করছে পুলিশ।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর: নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন ভূখণ্ড। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আমাদের সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রূপালীর মৃত্যু যেন সেই চিরন্তন প্রশ্নকেই আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। একজন নার্স, যিনি নিজে মানুষের সেবায় নিয়োজিত, তার নিজের জীবনই যখন রহস্যজনকভাবে শেষ হয়ে যায়, তখন সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগে: আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? নারীরা কি সত্যিই নিরাপদ?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। রূপালীর পরিবারের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। এই দাবি যেন শুধু একটি পরিবারের দাবি না থেকে হয়ে ওঠে গোটা জাতির দাবি। কারণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে আমাদের স্বাধীনতার মূল্য অর্থহীন হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন: এটি কি আত্মহত্যা নাকি খুন?
রূপালী দেবী সত্যিই মানসিক অবসাদে আত্মঘাতী হয়েছেন, নাকি অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, তা ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের পরেই পরিষ্কার হবে। তবে পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা এখনই কারও বিরুদ্ধে সরাসরি লিখিত অভিযোগ করছেন না। কিন্তু এটি আত্মহত্যা না কি খুন, কিংবা নির্যাতনের কারণে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা রক্ষায় স্বজনদের উপস্থিতিতে ময়নাতদন্তের পুরো বিষয়টি ভিডিওগ্রাফি করা হচ্ছে। আশা করা যায়, তদন্তকারীরা নিরপেক্ষ ও নিষ্ঠার সঙ্গে তদন্ত চালিয়ে সত্য উদঘাটন করবেন। কারণ, সত্য উদঘাটিত না হলে রূপালীর আত্মা শান্তি পাবে না, আর আমাদের সমাজও শিখবে না এই মৃত্যু থেকে কোনো শিক্ষা।