স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলার মানসিক হাসপাতালে দুর্নীতি: মানকুণ্ডুর 'আনন্দ আশ্রম'-এ তদন্ত কমিটি গঠন
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি ধারণ করে থাকা মানকুণ্ডু মানসিক হাসপাতাল, যা 'আনন্দ আশ্রম' নামে পরিচিত, এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে জর্জরিত। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের আদর্শে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে, একটি প্রাচীন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতার পরও সততা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা কত জরুরি।
হাওড়ার ব্যান্ডেল মেন লাইনের পশ্চিম পারে অবস্থিত এই হাসপাতালটি ১৯৩৯ সালে প্রায় ২২ বিঘা জমির উপর বিশিষ্ট চিকিৎসক হরনাথ বসু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটি এক সময় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরে সরকারি সাহায্যে পুরনো ভবন সংস্কার করে ৬০ শয্যার তিনতলা ভবন তৈরি করা হয়। ট্রাস্টি দ্বারা পরিচালিত এই হাসপাতালটি ভদ্রেশ্বর পুরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের খাঁ রোডের পাশে অবস্থিত। ২০১১ সালে পুরসভা পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
কেন এই হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাধীনতার আগে তৈরি এই হাসপাতালটি বাংলার চিকিৎসা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই অঞ্চলটি প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বর্তমানে এই হাসপাতালের দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর আমাদের স্বাধীনতার মূল্যবোধের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।
কী কী অভিযোগ উঠেছে?
সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনের পর ভদ্রেশ্বর পুরসভার চেয়ারম্যান ও তৃণমূল কাউন্সিলররা পদত্যাগ করলে পুরবোর্ড ভেঙে যায়। এর ফলে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা গত তিন মাস বেতন পাননি বলে দাবি করছেন। খবর পেয়ে চন্দননগর বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ ও চন্দননগর মহকুমা শাসক আশুতোষ কুমার হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন।
যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে:
- হাসপাতালের জায়গায় শতাধিক দোকানঘর তৈরি করা হয়েছে
- দোকানঘর টাকা নিয়ে বিক্রি করা হলেও এখনও হ্যান্ডওভার হয়নি
- ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা দিয়েও অনেকেই দোকানঘর পাননি
- হাসপাতালের ভিতরে থাকা পুকুর, গাছ, সাইকেল স্ট্যান্ড ও পরিকাঠামোগত দুর্নীতি
বিধায়কের বড় ঘোষণা
বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ বলেন, 'দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন মানসিক হাসপাতাল অথচ এখানে পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। চন্দননগর বিধানসভা এলাকার ভদ্রেশ্বর পুরসভায় অনেক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে। সেগুলো একে একে আমরা খুঁজে বার করছি।' তিনি আরও বলেন, 'প্রথমে এখানে যারা কর্মীরা রয়েছেন তাদের বেতনের ব্যাপারটা দেখা হচ্ছে। অনেকে রয়েছেন যারা পুরসভায় চাকরি করেন, আবার মানসিক হাসপাতালেও চাকরি করেন।'
তদন্ত কমিটি গঠন
চন্দননগর মহকুমা শাসক আশুতোষ কুমার জানান, 'যেহেতু এই হাসপাতালে অনেক রোগী রয়েছে, তাই তাদের যাতে চিকিৎসায় ব্যাঘাত না হয় সেটা দেখা আমাদের দায়িত্ব। আমরা একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করছি। কমিটি খতিয়ে দেখবে যে ঠিক কী হয়েছে, কোথায় কোথায় নিয়ম মানা হয়নি এবং আগামী দিনে কী করে চলা হবে। রোগীদের ওষুধ ও খাবার নিয়ে কোনোভাবেই কম্প্রোমাইজ করা হবে না।'
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিধায়ক জানান, বিদ্যুতের ব্যাকআপ, সিসি ক্যামেরা ও পরিশোধিত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হবে। ২০২২ সালের পর যত নিয়োগ হয়েছে এবং যত টাকা আয়-ব্যয় হয়েছে তার অডিট করা হবে। হাসপাতাল চালানোর লাইসেন্স বাতিলের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রশ্নোত্তর
মানকুণ্ডু মানসিক হাসপাতাল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এটি দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন মানসিক হাসপাতাল, যা ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলার চিকিৎসা ইতিহাসের সাক্ষী।
কর্মীদের বেতন কেন বন্ধ?
বিধানসভা নির্বাচনের পর ভদ্রেশ্বর পুরসভার চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলররা পদত্যাগ করায় পুরবোর্ড ভেঙে যায়, ফলে প্রশাসনিক সংকটে কর্মীরা তিন মাস বেতন পাননি।
তদন্ত কমিটি কী করবে?
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি হাসপাতালের আর্থিক অনিয়ম, অবৈধ নির্মাণ ও অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেবে।