পশ্চিমবঙ্গে মোদী-যোগীর পথে নতুন আইন, গণতন্ত্রের চরম সংকট
পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনের নামে এক কঠোর ও দমনমূলক আইন আনছে। 'দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ় বিল, ২০২৬' নামের এই আইনে বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত আটক এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটের দমনমূলক আইনের আদলে তৈরি এই বিল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের নতুন হাতিয়ার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন এই আইনে কী আছে?
গত বুধবার গেজেট নোটিফিকেশন হওয়া এই বিল আসন্ন সোমবার বিধানসভায় পেশ করা হতে পারে। সরকারের দাবি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই এর লক্ষ্য। কিন্তু এর ধারাগুলো স্পষ্টতই ব্যক্তির স্বাধীনতার পরিপন্থী। ভারতীয় ন্যায়সংহিতার সাধারণ আইন থেকে একে আলাদা করেছে দুটি চরম বিধান। এক, কাউকে জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করলে বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক (preventive arrest) করে রাখার ক্ষমতা। দুই, এই আইনের অধীনে অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার সরকারের হাতে তুলে দেওয়া।
সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং গুন্ডা বলতে কী বোঝায়?
আইনে সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে বিপদ ডেকে আনা, বৈধ ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করা এবং প্রাকৃতিক বা সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা। 'গুন্ডা' হিসেবে গণ্য করা হবে এমন সব ব্যক্তিকে, যারা এই ধরনের কার্যকলাপের সাথে যুক্ত বা নেতৃত্ব দেয়। ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ১১১ ও ১১২ ধারায় সংগঠিত অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা পড়েছে, তারাও এই তালিকায় পড়বে। অস্ত্র, মাদক বা মানবপাচার আইনে জড়িত ব্যক্তি এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলে পরিচিত ব্যক্তিদেরও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র সবসময়ই এই 'বিপজ্জনক' সংজ্ঞাটি তাদের সুবিধামতো ব্যবহার করে বিরোধীদের দমন করে, যা আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তির চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আটক এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া কী?
পুলিশ সুপার বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার যে কাউকে আটকের নির্দেশ দিতে পারবে। পুলিশ কমিশনার বা জেলাশাসক আটকের নির্দেশ দিলে অবিলম্বে ডিজিপিকে জানাতে হবে। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে কাউকে আটক করলে ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। আটকের পর আসামি পলাতক হলে আদালত পরোয়ানা জারি করবে এবং সেই পরোয়ানার ভিত্তিতেই তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে। এই আইনে পুলিশকে এমন ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি অশান্তি সৃষ্টি করতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে তাকে কোনো এলাকা থেকে বহিষ্কার করতে পারবে। পুলিশ ও সরকারি কর্মীদের জন্য আইনি রক্ষাকবচের বিধানও রয়েছে এখানে।
অ্যাডভাইসরি বোর্ডের ভূমিকা কতটা নিরপেক্ষ?
সরকার এই আইন কার্যকর করতে একটি অ্যাডভাইসরি বোর্ড গঠন করবে। এই বোর্ড আটকের যৌক্তিকতা বিচার করবে। বোর্ডের প্রধান হবেন হাই কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি এবং আরও দুজন সদস্য থাকবেন। আটক ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বোর্ড কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তা বড় প্রশ্ন।
মোদী-যোগীর মডেল এবং গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা
সংগঠিত অপরাধ রুখতে উত্তরপ্রদেশে ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে 'উত্তরপ্রদেশ গ্যাংস্টার আইন' এবং 'সংগঠিত অপরাধ দমন আইন'। ১৯৮৫ সালের আইন সংশোধন করে ২০১৫ সালে গুজরাটে চালু হয় 'সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠিত অপরাধ দমন আইন'। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই আইনগুলোকে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের সরকারি হাতিয়ার বলে আখ্যা দিয়েছে। আজ পশ্চিমবঙ্গেও একই পথে হাঁটছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ যে স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছিল, সেই চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ ভারতের রাজ্যগুলোতে প্রতিনিয়ত আইনের ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের মুক্তি ও অধিকার হরণ করা হচ্ছে। যে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য প্রতিবেশীর এই ধরনের দমনমূলক আইন চরম হুঁশিয়ারির সংকেত।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন আইন সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নগুলো
এই আইনে কত দিন বিনা বিচারে আটক থাকার বিধান রয়েছে?
এই আইনে কোনো ব্যক্তিকে জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করলে এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক (preventive arrest) করে রাখার বিধান রয়েছে।
আইনে 'গুন্ডা' হিসেবে কাদের গণ্য করা হবে?
সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত ব্যক্তি, সংগঠিত অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে যাদের বিরুদ্বে চার্জশিট পড়েছে এবং অস্ত্র বা মাদক আইনে জড়িত ব্যক্তিদের এই আইনে গুন্ডা হিসেবে গণ্য করা হবে।
পলাতক আসামির সম্পত্তির কী হবে?
আদালতের পরোয়ানা অমান্য করে আসামি পলাতক হলে তার সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।