একাত্তরের ছায়া থেকে মুক্তি: জামায়াতের জন্য ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ৫ দিকনির্দেশনা
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে যে রাজনৈতিক ভিত্তি, সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হলে জামায়াতে ইসলামীকে অতীতের জবাবদিহি ও আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক তাঁর শেষ বইয়ে দলটির জন্য পাঁচটি মৌলিক পরামর্শ রেখে গেছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা এবং নেতৃত্বের আধুনিকায়নসহ এই পরামর্শগুলো দলটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বইয়ে জামায়াতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা লিখে গেছেন আবদুর রাজ্জাক
২০২৫ সালের ৪ মে প্রয়াত হওয়ার আগে 'বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স' শীর্ষক বইটি রচনা করেছেন আবদুর রাজ্জাক। গত মাসে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) বইটি প্রকাশ করেছে। বইয়ের শেষ অধ্যায় 'জামায়াতের সামনে এগোনোর পথ'-এ দলটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিস্তারিত মূল্যায়ন করেছেন তিনি।
আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, '১৯৭১ সালের ছায়া এখনো জামায়াতের ওপর গভীরভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি দলটির তীব্র বিরোধিতা বোঝা জরুরি। কারণ, এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে দলটির প্রতি অনেক মানুষের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের মূল কারণ।' তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, বহু নাগরিকের কাছে জামায়াত শুধু একটি বেদনাদায়ক অতীতের স্মারক নয়, বরং এমন একটি দল যারা স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য এখনো পুরোপুরি জবাবদিহি করেনি।
১৯৭১-এর জবাবদিহি এড়ানো কেন রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পথে বাধা
বইয়ে আবদুর রাজ্জাক স্পষ্ট করেছেন, যে সমাজে ১৯৭১ জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি, সেখানে এই ইতিহাসকে উপেক্ষা করা জনগণের কাছ থেকে দলটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করবে। তাঁর মতে, 'জামায়াতের যেকোনো টেকসই রাজনৈতিক পুনরুত্থান শুরু করতে হবে নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে সৎভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে।'
তিনি সতর্ক করে দিয়ে লিখেছেন, 'জামায়াত যদি এই আত্মসমালোচনা ও অতীতের মুখোমুখি হওয়ার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা এমন একটি জনগোষ্ঠীর অবিশ্বাস ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারে, যারা একাত্তরের উত্তরাধিকারকে তাদের জাতীয় ইতিহাসের এমন একটি অংশ হিসেবে দেখে, যার সঙ্গে কোনো আপস সম্ভব নয়।'
নেতৃত্বের অনমনীয়তা ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে দূরত্ব
জামায়াতের সাংগঠনিক অনমনীয়তাকে দলটির পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আবদুর রাজ্জাক। তিনি লিখেছেন, 'বাংলাদেশের দ্রুত আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনশীল জনমিতি সত্ত্বেও জামায়াত অতীতে প্রোথিত একটি রক্ষণশীল কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে।'
তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, 'বয়স্ক ও রক্ষণশীল একটি অভিজাত গোষ্ঠীর প্রাধান্যে পরিচালিত জামায়াত তরুণ সমর্থকদের আকৃষ্ট করা ও ধরে রাখতে হিমশিম খেয়েছে। তরুণদের অনেকেই দলটির নেতাদের নিজেদের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে করেন।' তিনি সতর্ক করেছেন, জামায়াত যদি নতুন কণ্ঠস্বরের জন্য নিজেদের উন্মুক্ত না করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তাহলে দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি আরও বেশি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
ভাবমূর্তির সংকট ও বাইরের চাপ মোকাবিলায় কৌশলগত ভুল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার পর জামায়াতের কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়াকে দলটির জন্য রাজনৈতিক ও আবেগগত উভয় দিক থেকেই বড় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন আবদুর রাজ্জাক। তিনি লিখেছেন, 'এসব বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক এবং ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও জামায়াত এই অসন্তোষকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে বৃহত্তর জনসমর্থনে রূপ দিতে পারেনি।'
দলের ভাবমূর্তির সংকট আরও গভীর উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'জামায়াতকে এখনো কঠোরভাবে রক্ষণশীল এবং আধুনিকতার প্রতি প্রতিরোধী হিসেবে দেখা হয়। এমন ভাবমূর্তি শহুরে ভোটার ও শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশকে দলটি থেকে দূরে রাখে।'
দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গণমাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ এবং চলমান আইনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে জামায়াতকে। এর প্রতিক্রিয়ায় দলটি প্রায়ই নিজেদের নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপনের বয়ানের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু আবদুর রাজ্জাকের মতে, এই আত্মরক্ষামূলক অবস্থান জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সুযোগ হাতছাড়া
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরকারের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সামনে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছিল। জামায়াত শুধু এই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়নি, বরং বড় ধরনের ত্যাগও স্বীকার করেছে। তবে আবদুর রাজ্জাকের মতে, জামায়াত এই সম্পৃক্ততাকে অর্থবহ রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করতে পারেনি।
তিনি উল্লেখ করেছেন, 'নীতি ও শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকায় দলটি ওই সময়ের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।'
জামায়াতের জন্য ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ৫ পরামর্শ কী কী
বইয়ের একেবারে শেষাংশে আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সামনে এখন একটি সন্ধিক্ষণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটির অবস্থান অনস্বীকার্য। তবে দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই অতীতের মুখোমুখি হতে পারে কি না, যে অতীতকে তারা এখনো এড়িয়ে চলেছে। টিকে থাকতে হলে দলটিকে সাহস, দূরদর্শিতা এবং পরিবর্তনের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে জামায়াতের একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হলে দলটিকে মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এর জন্য আবদুর রাজ্জাক যে পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন তা হলো:
- অতীতের মুখোমুখি হওয়া: ১৯৭১ সালে নিজেদের ভূমিকার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রকৃত জবাবদিহির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া।
- নেতৃত্বের আধুনিকায়ন: তরুণ ও সংস্কারপন্থী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা, যাঁরা বর্তমান সময়ের ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।
- রাজনৈতিক কর্মসূচির বৈচিত্র্য আনা: আদর্শগত অনমনীয়তার বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া।
- তরুণদের সম্পৃক্ত করা: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচিত তরুণদের আকৃষ্ট করে এমন বয়ান ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
- আস্থা পুনর্গঠন: নাগরিক সমাজের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে উন্মুক্ত ও গঠনমূলক সংলাপে অংশ নেওয়া।
জামায়াতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
আবদুর রাজ্জাক তাঁর বইয়ে লিখে গেছেন, 'বিশ্বের অন্যান্য ইসলামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করলে জামায়াতের স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের অনেক সংগঠন নিজেদের আধুনিকায়ন করেছে, তারা নিজেদের আদর্শের সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সমন্বয় করেছে, কৌশল পরিবর্তন করেছে এবং শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যুতে মনোযোগ দিয়েছে।'
তিনি আরও লিখেছেন, 'জামায়াত যদি প্রাসঙ্গিক থাকতে চায়, তাহলে তাদের আধুনিকায়ন ও সংস্কার করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির পুনঃসমন্বয় ঘটাতে হবে।'
প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন আবদুর রাজ্জাক। ২০০৩ সালে তিনি দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়াকে কেন্দ্র করে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
মুক্তির বার্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, একাত্তরের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে দল একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে ছিল, তাদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও জবাবদিহির পথই একমাত্র মুক্তির পথ। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সেই পথেরই দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।