দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ: জাতির মুক্তিসংগ্রামের চেতনায় আঘাত
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আজ আবারও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে তা কেবল আইনি অপরাধই নয়, বরং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের আদর্শের প্রতি ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা।
নতুন অভিযোগে কী বলা হয়েছে?
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের সংবাদ সম্মেলনে সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগটি পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের কথা।
এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ কতটা গুরুতর?
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার। অভিযোগে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও উঠেছে।
দুই বোনজামাই ও ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের প্রতিক্রিয়া ও মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযোগ
দুদকের সংবাদ সম্মেলনের পর ফেসবুকে আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, 'অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।' এই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
এর আগে গত বুধবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের 'প্রাথমিক সত্যতা' পাওয়ার বিষয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। পরে তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের কাছে আইনি নোটিশ পাঠান।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, কোনো তদন্তের ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের কারণে তাঁকে নিয়ে 'মিডিয়া ট্রায়াল' শুরু হয়। এতে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে এমন ধারণা জনমনে তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
স্বাধীনতার চেতনা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজন
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার মূল ভিত্তি ছিল শোষণমুক্ত সমাজ গঠন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। সেই পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিটি জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক।
দুর্নীতি জাতির জন্য অভিশাপ। এটি আমাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করে, সামাজিক ন্যায়বিচারকে ধ্বংস করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তাই দুদকের এই অনুসন্ধানকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে একই সঙ্গে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে গণ্য করা হবে, এটিই আমাদের সংবিধানের মূল নীতি।
জাতির স্বার্থে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আজকের এই তদন্ত যদি সত্যিকার অর্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, তবেই আমরা ১৯৭১-এর শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখাতে পারব।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের নতুন অভিযোগ কী?
দুদকের নতুন অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করেছেন এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। এর মধ্যে দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ কীভাবে এই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন?
আসিফ মাহমুদ অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন এবং দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তদন্তের ফলাফল প্রকাশের আগেই 'মিডিয়া ট্রায়াল' শুরু হয়েছে, যা তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।
দুদক কবে থেকে এই অনুসন্ধান শুরু করেছে?
গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। সর্বশেষ অভিযোগটি পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।