জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের ঘোষণা: বিজয়ীর অধিকার লুটের মালে, বিশ্বব্যবস্থার জন্য সংকট
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য রক্ত দিয়েছিলাম, সেই মূল্যবোধ আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে চরম হুমকির মুখে। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নজিরবিহীন ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যুদ্ধে বিজয়ীই লুটের মালের মালিক হবে। এই ঘোষণা শুধু ভেনেজুয়েলার মতো দুর্বল দেশের জন্যই নয়, বিশ্বের সকল সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।
ভেনেজুয়েলা অভিযান ও তেলসম্পদ: ট্রাম্পের স্বীকারোক্তি
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে। এরপর এক বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে এই সামরিক অভিযান ও তেলচুক্তির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টেনেছেন।
“যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সে-ই পাবে, এটাই নিয়ম।”
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে ধরলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল এখন তাদের হাতে। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর কাছে আন্তর্জাতিক আইন বা নৈতিকতার চেয়ে সামরিক শক্তিই প্রধান হাতিয়ার।
ইরানকে হুমকি: জাতিসংঘের মঞ্চে যুদ্ধের ভাষ্য
একই ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ইরানের সঙ্গে চুক্তি করব, নাকি ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন করে দেব।” এমনকি তিনি ইরানকে “নরকে পাঠানোর” কথাও বলেন।
এটি নতুন নয়। ২০১৭ সালে জাতিসংঘে তাঁর প্রথম ভাষণে উত্তর কোরিয়াকে “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করার হুমকি দিয়েছিলেন। ৯ বছর পর ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, শক্তি প্রয়োগের এই বিশ্বাস তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দর্শনের অংশ।
সার্বভৌমত্বের ধারণাকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা
২০১৭ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কারও ওপর নিজের জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায় না; বরং শক্তিশালী, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পাশাপাশি কাজ করবে। কিন্তু গতকালের ভাষণে সেই সার্বভৌমত্বের ধারণাই উল্টে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ, কিন্তু দুর্বল দেশের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের “জাতীয় স্বার্থের” অধীন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা শিখেছি, সার্বভৌমত্ব কোনো দেশের উপহার নয়, এটি অর্জন করতে হয় সংগ্রামের মাধ্যমে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা সেই সংগ্রামের চেতনাকে অপমান করে।
জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে বিশ্ব সংস্থা গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল একতরফা সামরিক শক্তির বদলে আলোচনা, মধ্যস্থতা ও সম্মিলিত নিরাপত্তার মাধ্যমে বিরোধ মেটানো। জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করেছে।
ভেনেজুয়েলা বা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ট্রাম্পের প্রকাশ্য যুক্তি ছিল আরও বিস্তৃত: যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, শত্রুর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণ ও বিজয়ের পর অর্থনৈতিক সুবিধা। এটি জাতিসংঘের নীতি-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মনরো ডকট্রিনের বিস্তৃতি: বিশ্বজুড়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের হুমকি
১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন এবং পরে থিয়োডোর রুজভেল্টের ঘোষণার মাধ্যমে ওয়াশিংটন পশ্চিম গোলার্ধকে নিজের বিশেষ স্বার্থবলয় হিসেবে দেখতে শুরু করে। গতকাল ট্রাম্প সেই পুরোনো মতবাদকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, পশ্চিম গোলার্ধ তো বটেই, “আমাদের অঞ্চল এবং সারা বিশ্বে” প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।
কোথায়, কখন, কীভাবে সেই শক্তি প্রয়োগ হবে, সিদ্ধান্ত নেবে ওয়াশিংটন একাই। এটি বিশ্বের সকল স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সরাসরি হুমকি।
বহুপক্ষীয়তার প্রতি আঘাত: আইসিসি, ইউনেসকো ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান
ট্রাম্পের বহুপক্ষীয়তাবিরোধী অবস্থান ভাষণের অন্য অংশেও স্পষ্ট ছিল। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে “আমেরিকাবিরোধী” আখ্যা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে এই আদালত ত্যাগ করার আহ্বান জানান। তিনি আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার প্রস্তাবিত বৈশ্বিক কার্বন শুল্কের বিরোধিতা করেন এবং ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার ভূমিকার সঙ্গে অভিবাসনবিষয়ক অবস্থান জড়িয়ে আক্রমণ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ভোটারদের কথা মাথায় রেখে ভাষণ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেওয়া ট্রাম্পের এই ভাষণের শ্রোতা শুধু বিশ্বনেতারা ছিলেন না, দেশের ভেতরের ভোটারদের কথাও তাঁর মাথায় ছিল। ভাষণে কূটনীতি বা বহুপক্ষীয় সমঝোতার বদলে ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
সবশেষ রয়টার্স-ইপসস জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে। অনুমান করা যায়, সেই সমর্থন কিছুটা ফেরাতে তিনি নিজেকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, যেন গোটা বিশ্বের “কমান্ডার ইন চিফ” হিসেবে হাজির করতে চেয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য বার্তা: স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তা রক্ষা করতে হলে আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক শক্তির এই আগ্রাসী মনোভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা প্রমাণ করে, শক্তিধর দেশগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে, তখন দুর্বল দেশগুলোর সার্বভৌমত্বই প্রথম বলি হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে অবশ্যই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্ষম হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, ট্রাম্পের এই ঘোষণা দুর্বল হয়ে পড়া বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকে দিল।
FAQ: ট্রাম্পের ঘোষণা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ট্রাম্পের এই ঘোষণা কেন উদ্বেগজনক?
ট্রাম্প জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বলেছেন, যুদ্ধে বিজয়ীই লুটের মালের মালিক। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। এই ঘোষণা শুধু ভেনেজুয়েলা বা ইরানের জন্য নয়, বিশ্বের সকল দুর্বল ও স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য হুমকি।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে?
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। শক্তিধর দেশগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে, তখন ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। আমাদের অবশ্যই নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জাতিসংঘ এই পরিস্থিতিতে কী ভূমিকা রাখতে পারে?
জাতিসংঘকে অবশ্যই তার সনদ অনুযায়ী কাজ করতে হবে এবং একতরফা সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু ট্রাম্পের ভাষণ প্রমাণ করে, জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় জাতিসংঘের সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।