অনর্থক তর্ক পরিহার: বাঙালি মুসলমানের নৈতিক চেতনা
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়ে। আমাদের সামাজিক সংহতি ও নৈতিক উৎকর্ষের জন্য অযথা তর্কবিতর্ক পরিহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে মতভেদ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তার স্বভাবজাত বিষয়। কিন্তু এই মতভেদ যখন শালীনতা, সংযম ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে অহেতুক তর্কবিতর্কে রূপ নেয়, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
বাঙালি সংস্কৃতিতে সহনশীলতার ঐতিহ্য
আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের যে মহৎ ঐতিহ্য রয়েছে, তা ইসলামের শিক্ষার সাথে পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম অনর্থক তর্ককে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। অযথা বিতর্ক অন্তরের বিভেদ সৃষ্টি করে, ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে এবং পূর্ববর্তী বহু জাতির ধ্বংসের কারণ হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা পরস্পরের বিরোধিতা কোরো না, তাহলে তোমাদের অন্তরগুলো বিভক্ত হয়ে যাবে।" (মুসলিম)
জাতীয় ঐক্যে অনর্থক তর্কের ক্ষতিকর প্রভাব
স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের জাতীয় ঐক্য রক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অহেতুক বিতর্ক ও মতবিরোধ। বিদেশি শক্তিগুলো প্রায়শই আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য এই ধরনের অনর্থক তর্কের পরিবেশ তৈরি করে থাকে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপছন্দনীয় হলো সেই ব্যক্তি, যে অতিমাত্রায় ঝগড়াটে ও বাগিবতণ্ডাকারী।"
বিতর্ক এড়িয়ে চলার পুরস্কার
অনর্থক বিতর্ক এড়িয়ে চলা ব্যক্তির জন্য নবী (সা.) জান্নাতের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেছেন: "যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার।"
প্রয়োজনে সদ্ভাবে আলোচনা
তবে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইসলাম সদ্ভাবে, প্রজ্ঞা ও শালীনতার সঙ্গে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করার অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ বলেন: "তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দাও হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সদ্ভাবে।"
বাঙালি মুসলমানের আদর্শ
আমাদের বাঙালি মুসলমান পরিচয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মতো আচরণ করতে হবে। তারা জাহেল ও মূর্খ লোকদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে না। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: "তারাই পরম দয়াময়ের বান্দা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।"
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের জাতীয় ঐক্য, সামাজিক শান্তি এবং নৈতিক উৎকর্ষ বজায় রাখতে অযথা তর্ক বর্জন করে হিকমতপূর্ণ সংলাপ ও সহনশীলতার পথ অবলম্বন করতে হবে। এটিই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত চেতনা।