চীনের নৌশক্তি বৃদ্ধি: বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, তার মূল ভিত্তি ছিল বহিঃশক্তির আধিপত্য থেকে মুক্তি। আজ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে চীন ও আমেরিকার মধ্যে যে নৌশক্তির প্রতিযোগিতা চলছে, তা আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মহাসাগরে 'নিঃশব্দ খুনি'দের দাপাদাপি
ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ' (IISS) এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, চীন তার পরমাণু ডুবোজাহাজের বহর দ্রুত গতিতে সম্প্রসারণ করছে। এই 'নিঃশব্দ ঘাতক'গুলো আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে।
গত পাঁচ বছরে চীনের 'পিপলস লিবারেশন আর্মি' নৌবাহিনী অন্তত ১০টি পরমাণু ডুবোজাহাজ তাদের বহরে যুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে টাইপ-০৯৪ বা জিন ক্লাসের SSBN এবং টাইপ-০৯৩বি বা শ্যাং ক্লাসের আক্রমণাত্মক SSN।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল যে কোনো বহিঃশক্তির আধিপত্য থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের পথ নির্ধারণ করা। আজকের এই মহাশক্তিধর দেশগুলোর প্রতিযোগিতায় আমাদের অবস্থান হতে হবে সুচিন্তিত এবং স্বাধীন।
বঙ্গোপসাগর আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার। এই অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর নৌবহর বৃদ্ধি আমাদের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। ১৯৭১ সালের মতো আবারও আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
পরিসংখ্যানের চিত্র
IISS এর 'মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫' রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে চীনের কাছে রয়েছে:
- ১২টি আণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ
- ৬টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরমাণু ডুবোজাহাজ
- ৬টি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণাত্মক ডুবোজাহাজ
- ৪৬টি ডিজেলচালিত ডুবোজাহাজ
অন্যদিকে আমেরিকার কাছে রয়েছে ৬৫টি পরমাণু ডুবোজাহাজের বিশাল বহর।
আমাদের করণীয়
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের একটি স্বাধীন ও সুষম পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অনুসরণ করে আমাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর নির্গুণ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত: 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়।' কিন্তু একই সাথে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন থাকতে হবে।
চীনের 'বোহাই শিপবিল্ডিং হেভি ইন্ডাস্ট্রি' কোম্পানি বছরে একটি SSBN এবং দুটি SSN নির্মাণ করতে পারছে। এই দ্রুত সম্প্রসারণ ভারত-প্রশান্ত অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন করছে।
উপসংহার
১৯৭১ সালে আমরা প্রমাণ করেছিলাম যে স্বাধীনতার জন্য কোনো ত্যাগই বড় নয়। আজকের এই নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতেও আমাদের সেই চেতনা ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের নিজস্ব শক্তি ও কৌশল থাকতে হবে।
মহাসাগরে বৃহৎ শক্তিগুলোর এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী পথ বেছে নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া, যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারবে।