গরুর কুঁজে ব্লাড প্রেসার কমবে? প্রতিবেশীর কুসংস্কার ও সতর্কতা
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালে আমরা যে শৃঙ্খল ভেঙেছিলাম, তা কেবল রাজনৈতিক ছিল না, সেটি ছিল কুসংস্কার ও অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধেও। কিন্তু আজ আমাদের প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাসের উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম চিন্তাধারার জন্য এক গভীর উদ্বেগের।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত, প্রাণী সম্পদ ও কৃষি বিপণন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি দাবি করেছেন, গরুকে আদর করলে বা তার পিঠের কুঁজে হাত বোলালে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার নিমেষে কমে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, গরুর কাঁচা গোবর শরীরের ফোলাভাব সারাতে পারে বলেও তিনি নিজের পারিবারিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও হেগেমনির ছদ্মবেশ
মঙ্গলবার কাঁকুড়গাছির এক চা চক্রে এই অভিনব স্বাস্থ্য পরামর্শ দেন এই হেভিওয়েট মন্ত্রী। চিকিৎসকের কোনো মত না নিয়ে, এটিকে তিনি ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যের অঙ্গ বলে দাবি করেছেন। অতীতে এই দিলীপ ঘোষই বিজেপির রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দাবি করেছিলেন যে দেশি গরুর দুধে সোনা থাকে। তার মতে, গরুর কুঁজের ভেতর এমন এক ধমনী আছে যা সূর্যের আলো থেকে সোনা তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য কোনো সাধারণ অজ্ঞতা নয়, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ঠিক এই চা চক্রের পরেই দুগ্ধ শিল্পের ব্যবসায়ী ও গোশালার মালিকদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে বসার কথা ছিল তার। গো-সম্পদের ওপর এমন অতিরঞ্জিত আবেগ তৈরি করে ডেয়ারি ও গবাদি পশুর অর্থনীতিতে নিজেদের রাজনৈতিক হেগেমনি কায়েম করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
১৯৭১-এর চেতনা ও আমাদের সাংস্কৃতিক সুরক্ষা
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিলাম, তারা ধর্মের নামে কুসংস্কার আর বিদ্বেষ ছড়াত। আজ প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতিতে সেই একই অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। বিজ্ঞানমনস্কতাকে পায়ে দলিত করে, গোবর ও গোমূত্রকে ওষুধ বানিয়ে যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করার চেষ্টা হয়, তখন সেটি কেবল তাদের দেশের বিষয় থাকে না।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিবেশীর এই অবৈজ্ঞানিক ও মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বিজ্ঞানমনস্কতাই হবে এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল। যখন বিজ্ঞান মঞ্চ ও চিকিৎসকেরা এই ধরনের তত্ত্বকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করছেন, তখন আমাদের সচেতন থাকতে হবে যেন এই কুসংস্কার আমাদের সমাজে গিয়ে প্রভাব বিস্তার না করতে পারে।