সমুদ্রের গভীরে লুকানো পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাত
আমাদের স্বাধীন বাংলার প্রকৃতিপ্রেমীরা জানেন জলপ্রপাতের রূপ-সৌন্দর্যের কথা। কিন্তু জানেন কি, পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাতটি আমাদের চোখের সামনে নেই, বরং লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রের গভীরে?
জলপ্রপাত শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে নায়াগ্রা বা অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাতের মতো গর্জনকারী জলরাশির ছবি। কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাতকে চোখেই দেখা যায় না। ভূপৃষ্ঠেও নেই সেই জলপ্রপাত!
কোথায় লুকিয়ে আছে এই বিশাল জলপ্রপাত?
পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাতটি ডেনমার্ক প্রণালীতে গভীর জলের নীচে রয়েছে, যা সুমেরু মহাসাগরে গ্রিনল্যান্ডকে আইসল্যান্ড থেকে আলাদা করেছে। বিশাল সেই জলপ্রপাত 'ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট' নামে পরিচিত।
এই জলপ্রপাতের কার্যপ্রণালী অন্য জলপ্রপাতগুলির মতো নয়। এখানে কোনও পাথুরে পৃষ্ঠের উপর জল আছড়ে পড়ে না। জলবিন্দুর কুয়াশাও তৈরি হয় না। বরং এটি একটি ডুবো জলপ্রপাত।
কত বিশাল এই জলপ্রপাত?
যেখানে স্থলভাগের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত অ্যাঞ্জেলের উচ্চতা প্রায় ৩,২১২ ফুট (৯৮০ মিটার), সেখানে 'ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট'-এর আনুমানিক উচ্চতা প্রায় ১১,৫০০ ফুট (৩৫০০ মিটার)। অর্থাৎ, এর উচ্চতা ভূপৃষ্ঠের উপর থাকা যে কোনও জলপ্রপাতের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, সমুদ্রের নীচের এই জলপ্রপাত অ্যামাজন নদীর চেয়েও বেশি জল বহন করে। ফলে শুধু উচ্চতা বা আয়তনের দিক থেকে নয়, জলপ্রবাহের দিক থেকেও অন্য সব জলপ্রপাতকে ছাড়িয়ে গেছে।
কীভাবে তৈরি হয়েছে এই জলপ্রপাত?
নর্ডিক সমুদ্রের থেকে ঘন, ভারী বরফের জল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং হালকা আটলান্টিকের জলের নীচে ডুবে যায়। ফলে সমুদ্রের ওই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী নিম্নগামী ঢেউ তৈরি করে, যা ঠিক জলপ্রপাতের মতো আচরণ করে।
বিশাল আকার এবং শক্তি থাকা সত্ত্বেও, 'ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট'-এর ঠিক উপরেই জাহাজে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও মানুষও ওই জলপ্রপাত দেখতে পান না।
আবিষ্কার ও গুরুত্ব
উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছাড়া সমুদ্রের তলার এই বিশাল জলপ্রপাত সম্পূর্ণরূপে অজানাই থেকে যেত। ডেনমার্ক প্রণালীতে বিশদ সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয় জলপ্রপাতটি।
এই জলপ্রপাত 'আটলান্টিক মেরিডিয়োনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (AMOC)'-এর একটি অংশকে চালনা করতে সাহায্য করে। AMOC বিশ্বের সমস্ত সমুদ্রের একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা, যা বিশ্বের এক সাগর থেকে অন্য সাগরে তাপ, লবণ এবং পুষ্টি পরিবহণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি এই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়, তবে এটি আবহাওয়ার ধরন, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠের স্তরকেও প্রভাবিত করতে পারে।
প্রকৃতির এই অদৃশ্য বিস্ময় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের পৃথিবীতে এখনও অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে যা আবিষ্কারের অপেক্ষায়।